ভারতের অর্থনীতির আগামী দশকের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হতে চলেছে দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তাঁর মতে, ২০৩৬ সালের মধ্যে ভারতের মোট ভোগব্যয়ের প্রায় ৯৩ শতাংশই আসবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভোক্তা শ্রেণির হাত ধরে। ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মধ্যবিত্তের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।সম্প্রতি ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নির্মলা সীতারামন বলেন, ভারতের মধ্যবিত্ত আর শুধু উন্নয়নের সুবিধাভোগী নয়, বরং তারাই দেশের অর্থনীতির প্রকৃত ইঞ্জিন। তাঁদের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বিনিয়োগের প্রবণতা এবং বাজারে অংশগ্রহণ ভারতের অর্থনৈতিক গতি বাড়িয়ে তুলছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯৫ সাল থেকে এই শ্রেণির বার্ষিক বৃদ্ধির হার গড়ে ৬.৩ শতাংশ। অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থানের বিস্তার, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফলে এই শ্রেণির আকার ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে।
তিনি আরও জানান, অর্থনীতির বিকাশ এখন আর শুধু মুম্বই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা চেন্নাইয়ের মতো মহানগরকেন্দ্রিক নয়। দেশের টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরগুলিতেও দ্রুত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার ঘটছে। এর ফলে দেশের সম্পদের বণ্টন আরও বিস্তৃত হচ্ছে এবং নতুন নতুন শহর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসছে।
নির্মলা সীতারামনের দাবি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ৫০০টি শহর ভারতের নতুন অর্থনৈতিক হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এসব শহরে শিল্প, পরিষেবা, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এর ফলে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনই মধ্যবিত্তের আয় ও ক্রয়ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি সচল রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান হল ভোগব্যয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রমবর্ধমান কেনাকাটা উৎপাদন বাড়ায়, শিল্পে নতুন বিনিয়োগ টানে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তাঁর মতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে মূলত অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও মধ্যবিত্তের ব্যয়ের কারণেই।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল পেমেন্ট, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্প মধ্যবিত্তের বিস্তারে সহায়ক হয়েছে। ব্যাংকিং পরিষেবার সহজলভ্যতা, ডিজিটাল লেনদেন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগও অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছে |
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা OECD-এর পূর্বাভাসের কথাও তুলে ধরেন নির্মলা সীতারামন। সেই পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধিক মধ্যবিত্ত জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদি সেই পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং বৈশ্বিক বাজারেও ভারতের ভোক্তা শক্তির গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রসার শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, উৎপাদন, রিয়েল এস্টেট, অটোমোবাইল, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তি খাতের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কারণ এই শ্রেণির আয় বাড়লে বিভিন্ন খাতে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।সব মিলিয়ে নির্মলা সীতারামনের বক্তব্যে স্পষ্ট, আগামী এক দশকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের ক্রয়ক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং ভোগব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ভারতকে আরও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


