মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার আবহে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা, সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য বিঘ্ন এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেই এবার গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে যাচ্ছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। তাঁর এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ভারতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই সফরে বিদেশমন্ত্রী কাতার, বাহরিন, কুয়েত, ওমান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ সফর করবেন। পরবর্তীতে তাঁর যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম সফরেরও কর্মসূচি রয়েছে। এই সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ, জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে বলে জানা গেছে।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির একটি বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়লেই ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির উপর তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে কোনো বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সেই কারণেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কূটনৈতিক উদ্যোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে নয়াদিল্লি।
সম্প্রতি পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ঘিরে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও ভারত সরকার জানিয়েছে, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় তারা আগেই একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছিল। প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানির ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর আগেও সংসদে জানিয়েছিলেন যে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির উপর ভারত সরকার নিয়মিত নজর রাখছে। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন, ভারতের জাতীয় স্বার্থের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি ওই অঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তাও সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে ভারত শুধু জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তাই চাইছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বকেও আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। ফলে তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি নিশ্চিত করা ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এছাড়াও উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতাও বেড়েছে। এই সফরে সেই সমস্ত ক্ষেত্রেও নতুন আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভারত বিকল্প জ্বালানি উৎস, কৌশলগত তেল মজুত এবং বহুমুখী আমদানি নীতির উপরও জোর দিচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার চাইছে, কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের উপর না পড়ে এবং দেশে পেট্রোল-ডিজেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি তৈরি না হয়।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এস. জয়শঙ্করের এই সফর শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর নয়। বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বৈদেশিক নীতির দিক থেকে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সফরের ফলাফল ভবিষ্যতে ভারত ও উপসাগরীয় দেশগুলির সম্পর্ককে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে বলেই আশা করা হচ্ছে।


