পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC)। রাজ্যের বিধানসভায় খুব শীঘ্রই এই সংক্রান্ত একটি বিল পেশ করা হতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেছে। সেই তালিকাতেই এবার যুক্ত হতে চলেছে ইউসিসি বিল বলে মনে করা হচ্ছে |
বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনে রাজ্য সরকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে এবং আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নতুন আইন আনার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মূলত এমন একটি আইনি কাঠামো, যেখানে ধর্মভেদে আলাদা ব্যক্তিগত আইন না থেকে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং ভরণপোষণের মতো বিষয়ে সকল নাগরিকের জন্য একই আইন কার্যকর হবে। বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন বিদ্যমান। ইউসিসি চালু হলে সেই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে ক্ষমতায় এলে ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ইউসিসি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একাধিক সভায় এই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি সত্যিই এই বিল বিধানসভায় আনে, তাহলে তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ ইউসিসি শুধু একটি আইন নয়, এটি দীর্ঘদিনের একটি জাতীয় বিতর্কের বিষয়। সমর্থকদের দাবি, এই আইন নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে এবং ব্যক্তিগত আইনের বৈষম্য দূর করবে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই ইউসিসি নিয়ে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি অসম বিধানসভায় ইউসিসি বিল পাস হয়েছে। এর আগে উত্তরাখণ্ডেও একই ধরনের আইন কার্যকর হয়েছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে এই বিল আনার সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে।
তবে সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলের খসড়া প্রকাশ করেনি। ফলে বিলে কী কী ধারা থাকবে, কোন কোন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা বিধান রাখা হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বিলটি বিধানসভায় পেশ হলে তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিরোধী দলগুলিও ইতিমধ্যে এই ইস্যুতে সরব হতে শুরু করেছে। নির্বাচনী প্রচারের সময় ইউসিসি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছিল। ফলে বিলটি বিধানসভায় এলে শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউসিসি কার্যকর হলে প্রশাসনিক দিক থেকে একাধিক পরিবর্তন আনতে হবে। আদালত, রেজিস্ট্রি ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে নতুন আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে হবে। সেই কারণেই বিলটি পাস হওয়ার পর বাস্তবায়নের জন্য আলাদা রূপরেখা তৈরি করা হতে পারে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ইউসিসি এখন অন্যতম আলোচিত বিষয়। সরকার যদি বিধানসভায় বিলটি পেশ করে, তাহলে তা শুধু রাজনৈতিক নয়, সামাজিক এবং আইনি ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নজর রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনের দিকে।


