ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ক্রমশই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ধসে পড়া ভবন ও ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও বহু মানুষ আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই ব্যাপক যে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা জানতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। প্রথম কম্পনের মাত্রা ছিল ৭.২ এবং তার মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরেই ৭.৫ মাত্রার আরও একটি প্রবল ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চল সংলগ্ন এলাকা। কম্পনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বহু বহুতল ভবন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে এবং রাস্তায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি সূত্রে প্রথমে মৃতের সংখ্যা তুলনামূলক কম জানানো হলেও, সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ১৬৪ ছাড়িয়ে গিয়েছে এবং আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। তবে প্রশাসনের আশঙ্কা, এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলবর্তী লা গুয়াইরা অঞ্চল। বহু আবাসন, হোটেল, সরকারি ভবন এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা ধসে পড়েছে। বেশ কয়েকটি হাসপাতালও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আহতদের চিকিৎসায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। জরুরি পরিষেবা চালু রাখতে প্রশাসন অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প তৈরি করেছে।
উদ্ধারকারী দল দিনরাত এক করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, দমকল বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলও ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে। বহু জায়গায় এখনও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে জীবিত মানুষ থাকতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে ফাটল দেখা দিয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও মোবাইল পরিষেবা অনেক এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে নিখোঁজ আত্মীয়দের খোঁজ পেতে সমস্যায় পড়েছেন বহু পরিবার |
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য ত্রাণ, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলও ভেনেজুয়েলার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলার অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্প। পরবর্তী কয়েকদিন আফটারশকের আশঙ্কা থাকায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশ না করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
এই বিপর্যয় শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং দেশের অর্থনীতি ও পরিকাঠামোর ওপরও বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পুনর্গঠনের কাজ সম্পূর্ণ করতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে গোটা বিশ্বের নজর ভেনেজুয়ায়। উদ্ধারকর্মীরা সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন তথ্য সামনে আসছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনিক কর্তারা।


