বাজেটের দিনেই নব তৃণমূলের নতুন কমিটি ঘোষণা, ‘কে অভিষেক?’ প্রশ্ন ঋতব্রতের
পশ্চিমবঙ্গের বাজেট অধিবেশনের দিন রাজনৈতিক মহলেও দেখা গেল উল্লেখযোগ্য তৎপরতা। রাজ্যের বাজেট ঘোষণার পাশাপাশি ২২ জুন নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে অনুষ্ঠিত হল নব তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন বা স্পেশাল সেশন। দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক রূপরেখা, নেতৃত্বের কাঠামো এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দলের অন্যতম মুখ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান। পাশাপাশি তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে বিতর্কিত মন্তব্য করেও রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা উসকে দেন।
সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, দলের সাংগঠনিক শক্তি আরও মজবুত করার লক্ষ্যে রাজ্যজুড়ে নতুন করে জেলা কমিটি ও রাজ্য কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ অধিবেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অরূপ রায়। নতুন রাজ্য কমিটিতে চেয়ারম্যান অরূপ রায় ছাড়াও মোট ২৯ জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নতুন কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, রথীন ঘোষ, জয়দেব হালদার, বিপ্লব মিত্র, গোলাম রাব্বানি, সন্দীপন সাহা, আশিষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ একাধিক প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা। দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামানকে। ঋতব্রত জানান, দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের এই সিদ্ধান্ত দ্রুত নির্বাচন কমিশনের কাছেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
বৈঠকের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে ঋতব্রতের মন্তব্য। তিনি দাবি করেন, এদিনের বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনেই সমস্ত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে তিনি বলেন, “ক্যাঙ্গারু কোর্ট বলে একটি বিষয় রয়েছে। কে কীভাবে দল চালাবে, তা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না।”
এসময় দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান ঋতব্রত। তিনি বলেন, এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং একটি বিশেষ অডিট বা স্পেশাল অডিটর নিয়োগের আবেদনও করা হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, “অভিষেক কে? যাকে পাবলিক চোর পিটুনি দিয়েছিল?” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু কমিটি গঠনেই থেমে থাকছে না নব তৃণমূল। ঋতব্রত জানান, খুব শীঘ্রই দলের মুখপাত্রদের প্যানেলও গঠন করা হবে। জাতীয় কর্মসমিতির কাঠামো তৈরি করে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সমস্ত জায়গায় আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। তাঁর দাবি, দলের সমস্ত কর্মকাণ্ড তৃণমূল কংগ্রেসের মূল সংবিধান মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনও নেতার নাম ঘোষণা হওয়ার পরের দিনই তিনি দল পরিবর্তন করে ফেলছেন। কিন্তু নব তৃণমূল সেই পথে হাঁটতে চায় না। সংগঠনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ম ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনেই সম্পন্ন করা হবে। দলের সঙ্গে যুক্ত অরূপ রায়, বিপ্লব মিত্রের মতো নেতাদের তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যোদ্ধা বলে উল্লেখ করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঋতব্রত বলেন, তিনি চাইলে দলের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারেন। যদিও এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
অন্যদিকে, সর্বভারতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর অরূপ রায় বলেন, দলের কর্মীরা তাঁকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তিনি সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করবেন। তাঁর মতে, বর্তমান বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোই দলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অরূপ রায় স্মরণ করিয়ে দেন যে ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি রাজনৈতিক লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। মানুষের অধিকার, সম্মান এবং উন্নয়নের প্রশ্নে লড়াই করাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল লক্ষ্য। নব তৃণমূলও সেই আদর্শকে সামনে রেখেই আগামী দিনে সংগঠনকে আরও বিস্তৃত করতে চায় বলে তিনি জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের দিনেই নব তৃণমূলের নতুন কমিটি ঘোষণা এবং সংগঠনের পুনর্গঠনের উদ্যোগ রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি এবং সাংগঠনিক বিস্তারের মাধ্যমে দলটি আগামী দিনে কতটা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে।



