ভারতে সোনার প্রতি মানুষের আবেগ ও আকর্ষণ যুগ যুগ ধরে অটুট। বিয়ে, উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সোনার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনা ভোক্তা দেশ হওয়া সত্ত্বেও ভারত এখনও তার মোট চাহিদার অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করে। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। তবে এবার সেই নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কারণ অন্ধ্রপ্রদেশের কুর্নুল জেলায় প্রায় ৫০ টন সোনার মজুতের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা দেশের খনিজ সম্পদ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজ্যের খনি ও ভূতত্ত্ব দফতরের তথ্য অনুযায়ী, কুর্নুল জেলার জোন্নাগিরি এলাকায় এই বিপুল সোনার ভাণ্ডারের সম্ভাব্য অস্তিত্ব চিহ্নিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক সমীক্ষা ও ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এলাকাটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনার উপস্থিতির ইঙ্গিত মিলেছে। ইতিমধ্যেই সেখানে খনন এবং অনুসন্ধানমূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারতের সোনা উৎপাদন ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
শুধুমাত্র জোন্নাগিরি নয়, অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের নজরে রয়েছে আরও কয়েকটি সম্ভাবনাময় এলাকা। রামাগিরি, জাভাকুলা এবং চিগুরুকুন্তা-বিসনাতম অঞ্চলেও সোনার খনিজ সম্পদের সন্ধানে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের ধারণা, এই অঞ্চলগুলিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ সম্পদ থাকলে অন্ধ্রপ্রদেশ ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান খনিজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
ভারতের সোনা উৎপাদনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত দুই দশকে দেশীয় উৎপাদন বিশেষ উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। একসময় কর্নাটকের কোলার গোল্ড ফিল্ডস ছিল দেশের গর্ব। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া সেই খনি বহু দশক ধরে ভারতের সোনা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং লাভজনকতা কমে যাওয়ার কারণে ২০০০ সালে কোলার গোল্ড ফিল্ডস বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে দেশের সোনা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বর্তমানে কর্নাটকের হুত্তি গোল্ড মাইনসই ভারতের অন্যতম প্রধান সক্রিয় সোনা খনি। কিন্তু সেখান থেকে বছরে গড়ে মাত্র দেড় টন সোনা উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে দেশের বার্ষিক সোনার চাহিদা ৮০০ টনেরও বেশি। ফলে এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি করতে হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি পায় এবং বাণিজ্য ঘাটতিও বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে জোন্নাগিরি গোল্ড প্রজেক্ট বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাধীনতার পর এটিকে ভারতের প্রথম বৃহৎ বেসরকারি সোনা খনন প্রকল্পগুলির মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে। জিওমাইসোর সার্ভিসেস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পে ইতিমধ্যেই ৪০০ কোটিরও বেশি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রায় ৫৯৮ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ওপেন-পিট খনিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে খননকাজ পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন শুরু হলে আগামী ১৫ বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় এক টন পরিশোধিত সোনা উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। যদিও দেশের মোট চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ এখনও অনেক কম, তবুও এটি দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বৃহৎ সোনার ভাণ্ডারের সন্ধান পাওয়া যায় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উৎপাদন সম্ভব হয়, তাহলে ভারতের সোনা আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের জোন্নাগিরিতে সম্ভাব্য ৫০ টন সোনার ভাণ্ডারের আবিষ্কার শুধু একটি খনিজ অনুসন্ধানের খবর নয়, বরং এটি ভারতের খনিজ শিল্প, অর্থনীতি এবং স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় সম্ভাবনার বার্তা বহন করছে। আগামী কয়েক বছরে প্রকল্পটির অগ্রগতি এবং প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতাই নির্ধারণ করবে এই আবিষ্কার কতটা বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।


