আকাশগঙ্গার কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বর থেকে রহস্যময় কণাপ্রবাহ, মিলল অর্ধশতাব্দী পুরনো রহস্যের সমাধান
মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বস্তু কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে আবারও চমকপ্রদ আবিষ্কারের খবর সামনে এসেছে। আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর ‘স্যাজিটারিয়াস এ*’ (Sagittarius A*)-এর চারপাশ থেকে রহস্যময় কণাপ্রবাহ বা আউটফ্লোর অস্তিত্বের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের অনুসন্ধান ও গবেষণার পর এই আবিষ্কার মহাকাশবিজ্ঞানীদের কাছে এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বের অধিকাংশ সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে গ্যাস, ধূলিকণা ও অন্যান্য পদার্থ জমা হয়ে একটি ঘূর্ণায়মান চাকতির সৃষ্টি করে। এই অঞ্চল থেকে প্রায়ই শক্তিশালী কণাপ্রবাহ বা বায়ুপ্রবাহ নির্গত হতে দেখা যায়। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থ কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে এমন কোনও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল—আমাদের ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বর কি অন্যদের থেকে আলাদা?
সম্প্রতি সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। চিলিতে অবস্থিত অত্যাধুনিক ALMA (Atacama Large Millimeter/submillimeter Array) টেলিস্কোপ এবং মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা NASA-র চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরির তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখতে পেয়েছেন যে স্যাজিটারিয়াস এ* অঞ্চলের চারপাশে একটি বিশাল শঙ্কু আকৃতির গহ্বর তৈরি হয়েছে। এই গহ্বর উত্তপ্ত এবং বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয় গ্যাসে পূর্ণ।
গবেষকদের ধারণা, কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে নির্গত হওয়া কণাপ্রবাহই আশপাশে থাকা শীতল গ্যাসকে সরিয়ে দিয়ে এই বিশাল গহ্বরের সৃষ্টি করেছে। মহাকাশে এত বড় আকারের গহ্বর তৈরির জন্য বিপুল শক্তির প্রয়োজন হয়, যা সাধারণ কোনও মহাজাগতিক ঘটনার ফলে সম্ভব নয়। বরং একটি সক্রিয় অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরই এই শক্তির উৎস হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কৃষ্ণগহ্বর নিজে কোনও পদার্থ বা আলো বাইরে বের করতে পারে না। তার মহাকর্ষীয় টান এতটাই শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত তার সীমা অতিক্রম করতে পারে না। কিন্তু কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে জমা হওয়া পদার্থ যখন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকে, তখন সেই প্রক্রিয়া থেকে শক্তিশালী কণাপ্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রবাহই আশপাশের মহাজাগতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক লেনা মুর্চিকোভা। তাঁর নেতৃত্বাধীন গবেষণা দলের ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী “The Astrophysical Journal Letters”-এ প্রকাশিত হয়েছে।
লেনা মুর্চিকোভা জানিয়েছেন, “প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এই ধরনের কণাপ্রবাহের প্রমাণ খুঁজছিলেন। অবশেষে আমরা সেই রহস্যের সমাধানের পথে এগোতে পেরেছি।”
স্যাজিটারিয়াস এ* পৃথিবী থেকে প্রায় ২৬ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সেখানে তৈরি হওয়া গহ্বরটির প্রকৃত আকার এখনও পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পর্যবেক্ষণযোগ্য অংশের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ছয় আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তবে এই আবিষ্কারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল কণাপ্রবাহের প্রকৃতি। সাধারণত অন্যান্য ছায়াপথের কৃষ্ণগহ্বরগুলিতে যে বায়ুপ্রবাহ দেখা যায়, তার গতি অত্যন্ত তীব্র এবং ধ্বংসাত্মক। কিন্তু আকাশগঙ্গার কেন্দ্রস্থ কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে কণাপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে শান্ত ও ধীরগতির। কোনও ভয়াবহ মহাজাগতিক ঝড়ের লক্ষণ এখানে পাওয়া যায়নি।
গবেষক মার্ক গোরস্কির ভাষায়, “এটি আমাদের কৃষ্ণগহ্বরের একটি মৃদু কণাপ্রবাহ। বর্তমানে এটি ছায়াপথের কেন্দ্রকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করার মতো শক্তিশালী নয়।”
বিজ্ঞানীদের মতে, অধিকাংশ অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই এমন শান্ত অবস্থায় কাটায়। তবে কখনও কখনও সেখানে প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চিত হয়ে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ ও শক্তিশালী কণাপ্রবাহের সৃষ্টি হয়, যা সম্পূর্ণ ছায়াপথের গঠনকেও বদলে দিতে পারে।
এই নতুন আবিষ্কার শুধু আকাশগঙ্গার কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে বহুদিনের একটি রহস্যের সমাধানই করেনি, বরং নতুন কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করেছে। ঠিক কীভাবে এই কণাপ্রবাহ সৃষ্টি হচ্ছে, এর প্রকৃত শক্তি কতটা এবং ভবিষ্যতে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—সেসব বিষয় নিয়ে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।
মহাকাশবিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতের আরও উন্নত টেলিস্কোপ এবং পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আপাতত বলা যায়, আকাশগঙ্গার হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর আবারও প্রমাণ করল যে মহাবিশ্ব এখনও বিস্ময়ে ভরা এক অজানা জগৎ।


