পশ্চিমবঙ্গে স্কুলের মিড-ডে মিল বা মধ্যাহ্নভোজ প্রকল্পকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই নতুন তথ্য সামনে এসেছে। রাজ্যের জেলাগুলিতে এখনই মিড-ডে মিলের দায়িত্ব নিচ্ছে না ইসকন বা ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস। আপাতত কলকাতার নির্দিষ্ট কিছু স্কুলে রান্না করা খাবার সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও জেলা স্তরে এই দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গিয়েছে।
মিড-ডে মিল প্রকল্পে ইসকনের ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্কুলের খাবারের তালিকা থেকে ডিম বাদ পড়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলার খাদ্যাভ্যাস, শিশুদের পুষ্টি এবং সরকারি প্রকল্পে ধর্মীয় সংগঠনের ভূমিকা—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নানা মহলে আলোচনা চলছে।
## আপাতত জেলা স্তরে দায়িত্ব হস্তান্তর নয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের জেলাগুলিতে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব এখনই ইসকনের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। কলকাতার কিছু স্কুলে রান্না করা খাবার সরবরাহের প্রস্তাব এবং জেলা স্তরে গোটা প্রকল্প পরিচালনার বিষয়টি এক নয়। ফলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে যে সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়েছে, তা সরাসরি রাজ্যের সমস্ত জেলার ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না।
জেলা স্তরে মিড-ডে মিল প্রকল্প সাধারণত স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। বহু জায়গায় স্কুলের নিজস্ব রান্নাঘর রয়েছে। কোথাও আবার স্থানীয় রান্নার কর্মী বা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে খাবার তৈরি করা হয়। এই পরিকাঠামো একসঙ্গে বদলাতে গেলে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, অর্থ বরাদ্দ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।
তাই আপাতত জেলা স্তরে ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়ার কোনও তৎপরতা নেই বলেই খবর। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
## কলকাতায় ইসকনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
রাজ্যের স্কুলগুলিতে রান্না করা মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে মূল বিতর্ক শুরু হয় কলকাতাকে কেন্দ্র করে। ইসকনের সহযোগী সংস্থা অন্নমিত্র ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নিরামিষ খাবার দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ইসকনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের রান্না করা খাবারে ডিম, মাছ বা মাংসের মতো আমিষ পদ থাকবে না। এই সিদ্ধান্তের পরেই নানা প্রশ্ন ওঠে। কারণ, বাংলার বহু পরিবারে ডিম ও মাছ দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্কুলের মধ্যাহ্নভোজে ডিম দেওয়া হয় শিশুদের প্রোটিন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণের কথা মাথায় রেখে।
সমালোচকদের অভিযোগ, সরকারি স্কুলের খাবারের তালিকা কোনও ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পছন্দের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। সেখানে শিশুদের বয়স, পুষ্টির প্রয়োজন এবং স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। অন্যদিকে, ইসকনের পক্ষ থেকে নিরামিষ খাবারের মাধ্যমে পুষ্টিকর বিকল্প দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
## ডিম বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন
মিড-ডে মিল প্রকল্পে ডিম নিয়ে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি তীব্র হয়েছে। বহু বছর ধরে বাংলার স্কুলগুলিতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ডিম দেওয়া হয়। ডিম তুলনামূলকভাবে সস্তা, সহজলভ্য এবং প্রোটিনের ভালো উৎস হওয়ায় শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পুষ্টিবিদদের একাংশ।
ইসকনের রান্না করা খাবারে ডিম না থাকার সম্ভাবনা সামনে আসতেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা কীভাবে পূরণ করা হবে। প্রশাসনের তরফে নিরামিষ বিকল্প হিসেবে ডাল, সয়াবিন, ডালজাতীয় খাবার বা অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ পদ রাখার কথা ভাবা হতে পারে। তবে বিকল্প খাবারের পরিমাণ, পুষ্টিমান এবং নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
শুধু খাবারের তালিকা পরিবর্তন করলেই হবে না। শিশুরা বাস্তবে কতটা খাবার খাচ্ছে, খাবারের মান কেমন, রান্না ও সরবরাহের সময়সীমা বজায় থাকছে কি না—এসব বিষয়ও নজরে রাখতে হবে। কারণ, মিড-ডে মিলের মূল উদ্দেশ্য হল স্কুলপড়ুয়াদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো।
## জেলা স্তরে কেন আলাদা ব্যবস্থা?
কলকাতা এবং রাজ্যের জেলার পরিস্থিতি এক নয়। কলকাতায় স্কুলের সংখ্যা, ছাত্রছাত্রীর ঘনত্ব, রান্না করা খাবার পরিবহণের সুযোগ এবং কেন্দ্রীয় রান্নাঘরের পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে আলাদা। জেলার বহু স্কুলে স্থানীয় স্তরে রান্না হয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও ভিন্ন।
গ্রামাঞ্চলে অনেক স্কুলে রান্নার কাজে স্থানীয় মহিলা কর্মী বা স্বনির্ভর গোষ্ঠী যুক্ত থাকেন। মিড-ডে মিল প্রকল্প তাঁদের জীবিকার সঙ্গেও সম্পর্কিত। ফলে কোনও বাইরের সংস্থার হাতে দায়িত্ব তুলে দিলে তাঁদের কাজের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এছাড়া প্রত্যন্ত এলাকায় খাবার পৌঁছে দেওয়া, খাবার গরম রাখা, রান্নাঘরের মান বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পরিবেশন করা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই জেলা স্তরে দায়িত্ব বদলের আগে বিস্তারিত সমীক্ষা ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
## রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত
ইসকনকে মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, সরকারি স্কুলের খাবারে ধর্মীয় সংগঠনের প্রভাব তৈরি করা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি প্রকল্পে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং পুষ্টির মান বজায় রাখা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসকনের মতো সংগঠনের রান্না করা খাবার সরবরাহের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে খাবার তৈরি এবং সময়মতো সরবরাহ করা গেলে তা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। তবে এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নির্ভর করবে খাবারের মান, খরচ, পুষ্টিমান এবং বাস্তব ব্যবস্থাপনার উপর।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে অভিভাবকদের মূল উদ্বেগ হল সন্তানরা নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে কি না। তাঁদের কাছে খাবারের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল খাবারের গুণমান, পরিমাণ এবং নিরাপত্তা।
## ওড়িশা মডেল নিয়ে আলোচনা
ডিম সংক্রান্ত বিতর্কের মধ্যে ওড়িশার মডেল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সেখানে কোনও কোনও ক্ষেত্রে মূল রান্না করা খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করে স্কুলগুলিকে ডিম কেনার সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা যায়।
পশ্চিমবঙ্গেও এমন কোনও বিকল্প ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা হয়েছে। যদি ইসকনের রান্না করা খাবারে ডিম না থাকে, তাহলে স্কুল পরিচালন সমিতি বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আলাদা করে ডিম দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এই ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে হলে অর্থ বরাদ্দ, খাদ্য নিরাপত্তা, রান্না ও পরিবেশনের নিয়ম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু ঘোষণা করলেই হবে না, প্রতিটি স্কুলে তা কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
## শিশুদের পুষ্টিই প্রধান বিষয়
মিড-ডে মিল প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কখনওই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিতর্ক হওয়া উচিত নয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল স্কুলপড়ুয়া শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি কমানো, ক্ষুধার কারণে পড়াশোনায় বাধা দূর করা এবং স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালরি, প্রোটিন, আয়রন, ভিটামিন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকা জরুরি। ডিম না থাকলে তার উপযুক্ত বিকল্প দিতে হবে। নিরামিষ খাবার দিয়েও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু তার জন্য সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়াও শিশুদের খাদ্যাভ্যাস ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কোনও একটি নির্দিষ্ট খাদ্যপদ্ধতি সব এলাকার শিশুদের উপর চাপিয়ে না দিয়ে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী মেনু তৈরি করা হলে তা বেশি কার্যকর হতে পারে।
## ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত হতে পারে?
এই মুহূর্তে জেলা স্তরে ইসকন মিড-ডে মিলের দায়িত্ব নিচ্ছে না। তবে কলকাতায় পরীক্ষামূলক বা নির্দিষ্ট পরিসরে যে ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে, তার ফলাফল ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসন যদি মনে করে রান্না করা খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং পুষ্টিকর, তাহলে ভবিষ্যতে তা আরও বিস্তৃত করার কথা ভাবা হতে পারে। আবার খাবারের মান, সরবরাহ, পুষ্টি বা স্থানীয় আপত্তি নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে পরিকল্পনায় পরিবর্তনও আসতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষক, অভিভাবক, পুষ্টিবিদ, রান্নার কর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের মতামত নেওয়া। কারণ, মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রত্যেক পক্ষের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে।
## উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের জেলাগুলিতে আপাতত মিড-ডে মিলের দায়িত্ব নিচ্ছে না ইসকন। কলকাতাকে কেন্দ্র করে রান্না করা খাবার সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখনও জেলা স্তরে কার্যকর হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে রাজ্যের সমস্ত স্কুলের খাবারের ব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেই।
তবে ডিম বাদ দেওয়া, নিরামিষ মেনু, শিশুদের পুষ্টি এবং সরকারি প্রকল্পে ধর্মীয় সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইসকনকে জেলা স্তরে দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পুষ্টি-সমীক্ষা এবং জনমতের উপর।
সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েই মিড-ডে মিল প্রকল্প পরিচালনা করা প্রয়োজন। খাবারের মান, পরিমাণ এবং নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত যে কোনও সিদ্ধান্তের প্রধান লক্ষ্য।


