অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভুয়ো ডাক্তার এবং জাল ডিগ্রির অভিযোগ ঘিরে তদন্তের মধ্যেই এবার নজরে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান খুলে হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক চিকিৎসার নামে কোর্স করানো, ডিগ্রি দেওয়া এবং এমনকি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়ালকে চিঠি দিয়েছে কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন, ওয়েস্ট বেঙ্গল।
কাউন্সিলের অভিযোগ, রাজ্যজুড়ে একাধিক ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, যারা কোনও সরকারি বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসা সংক্রান্ত কোর্স চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেইসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের হাতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বরও তুলে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই ধরনের কার্যকলাপকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে জানিয়েছে কাউন্সিল।
## কোচবিহারে ‘বায়োকেমিক হোমিও ইন্সটিটিউট’-এর খোঁজ
সম্প্রতি ‘বায়োকেমিক হোমিও ইন্সটিটিউট’ নামে একটি সংগঠনের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। অভিযোগ, ওই সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ২৩টি প্রতিষ্ঠান খুলে ফেলেছে। কোচবিহারে রয়েছে সংগঠনটির মূল অফিস। সেখান থেকেই হোমিওপ্যাথি এবং বায়োকেমিক চিকিৎসা সংক্রান্ত পড়াশোনা করানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর কোচবিহারের ঘুঘুডাঙায় অবস্থিত ওই প্রতিষ্ঠানের অফিসে তালা ঝোলানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য দফতরকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনাতেও ওই সংগঠনের একটি অফিসের খোঁজ মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। এছাড়াও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং ও সোনারপুর, হাবড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো এলাকাতেও একই ধরনের ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে বলে কাউন্সিল সূত্রে খবর।
প্রশ্ন উঠছে, এতগুলি প্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে কীভাবে সেখানে ছাত্রছাত্রী ভর্তি, ক্লাস এবং ডিগ্রি প্রদানের মতো কার্যক্রম চলছিল, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।
## অনুমোদন ছাড়া কলেজ খোলা বেআইনি
কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন, ওয়েস্ট বেঙ্গল-এর রেজিস্ট্রার ডা. মিঠুন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, একাধিক ভুয়ো কলেজে হোমিওপ্যাথি এবং বায়োকেমিক পড়ানো হচ্ছে। এমনকি ওই প্রতিষ্ঠানগুলি নিজেদের মতো করে রেজিস্ট্রেশন নম্বরও দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নিয়ম অনুযায়ী, কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন, ওয়েস্ট বেঙ্গল এবং ন্যাশনাল কমিশন অফ হোমিওপ্যাথির অনুমোদন ছাড়া রাজ্যে কোনও হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ খোলা যায় না। পশ্চিমবঙ্গে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হল কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন। তাই অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হলে তা নিয়মবিরুদ্ধ বলেই বিবেচিত হবে।
কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই রাজ্যের প্রতিটি জেলার জেলাশাসককে বিষয়টি জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল কমিশন ফর হোমিওপ্যাথিকেও অভিযোগ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা পুলিশের লালবাজারের যুগ্ম কমিশনারকেও এই বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
## প্রকৃত চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চুরির অভিযোগ
শুধু অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগ নয়, আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, এক প্রকৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চুরি করে অন্য জায়গায় চেম্বার খুলে বসেছেন এক ব্যক্তি।
টালিগঞ্জের রিজেন্ট পার্ক এলাকার এক প্রবীণ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক সম্প্রতি কাউন্সিলের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে নদিয়া জেলায় একজন ভুয়ো চিকিৎসক চেম্বার খুলেছেন। এই অভিযোগ সত্যি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরিচয় ও পেশাগত সুনামের ক্ষতি নয়, রোগীদের জন্যও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
কারণ, কোনও চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে অন্য কেউ চিকিৎসা করলে রোগীরা ভুল করে তাঁকেই প্রকৃত চিকিৎসক বলে ধরে নিতে পারেন। এর ফলে ভুল চিকিৎসা, ভুল ওষুধ প্রয়োগ এবং রোগ নির্ণয়ে গুরুতর সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
## সাধারণ মানুষ কীভাবে সতর্ক হবেন?
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দ্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার সাধারণ সম্পাদক কাকলী বন্দ্যোপাধ্যায় কুণ্ডু জানিয়েছেন, কাউন্সিল অফ হোমিওপ্যাথি মেডিসিনের ওয়েবসাইটে ‘প্র্যাকটিশনার লিস্ট’ দেওয়া থাকে। কোনও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে সেই তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে কি না, তা যাচাই করা উচিত।
চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন নেওয়ার সময় সেখানে রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ রয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে থাকা প্র্যাকটিশনার লিস্টে টাইপ করে যাচাই করা যেতে পারে। ওই নম্বরের সঙ্গে চিকিৎসকের নাম এবং পরিচয় মিলছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
কোনও চিকিৎসক যদি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিতে না চান, অথবা তাঁর দেওয়া নম্বর অনলাইনে খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। একইভাবে কোনও প্রতিষ্ঠান যদি খুব অল্প সময়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হওয়ার ডিগ্রি, সার্টিফিকেট বা রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলেও তার বৈধতা যাচাই করা দরকার।
## ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি
কাউন্সিলের বক্তব্য, জাল প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে অনেকেই চিকিৎসকের পরিচয়ে চেম্বার খুলে বসছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছেন। প্রকৃত চিকিৎসকদের পাশাপাশি পুরো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও কোর্সে ভর্তি হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন, কোর্সের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বীকৃতি যাচাই করা উচিত। শুধু কোনও সার্টিফিকেট বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকলেই যে তা বৈধ, এমনটা নয়। সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
এখন দেখার, রাজ্য সরকার, স্বাস্থ্য দফতর, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি এই অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয়। ভুয়ো প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে তদন্ত, বেআইনি ডিগ্রি প্রদান বন্ধ করা এবং জাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।


