গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের উদ্যোগ এবার আরও বড় আকারে শুরু হতে চলেছে বাংলাতেও। গ্রামাঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা মেটানো, গোবর ও জৈব বর্জ্যের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণ কমানোর লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের পঞ্চায়েত দফতর এবং সেন্ট্রাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিএমইআরআই-এর সহযোগিতায় এই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ হয়েছে বলে খবর।
এতদিন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরির প্রকল্প দেখা গেলেও বাংলায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও অনেকটাই সীমিত। এবার গ্রামবাংলায় এই ব্যবস্থাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা তৈরি হবে, তেমনই অন্যদিকে গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাও অনেকটা কমতে পারে।
## গোবর থেকেই তৈরি হবে জ্বালানি
গবাদি পশুর গোবরকে সাধারণত গ্রামাঞ্চলে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কোথাও কোথাও শুকনো গোবর জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই গোবর থেকেই বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় গোবরকে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে রাখা হয়। অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে জীবাণুর সাহায্যে গোবর পচে মিথেন-সমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি করে।
এই গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায়। উপযুক্ত পরিকাঠামো থাকলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদন বা অন্যান্য শক্তির কাজেও কাজে লাগানো সম্ভব। গোবর থেকে গ্যাস উৎপাদনের পর যে অবশিষ্ট পদার্থ থাকে, সেটি জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ফলে একইসঙ্গে জ্বালানি এবং সার—দুই ধরনের উপকার পাওয়া সম্ভব।
এই কারণেই বায়োগ্যাসকে গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে রান্নার জ্বালানি কেনার খরচ কমতে পারে। পাশাপাশি কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
## পঞ্চায়েত দফতর ও সিএমইআরআই-এর সহযোগিতা
রাজ্যের পঞ্চায়েত দফতর এই প্রকল্পকে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সিএমইআরআই-এর সঙ্গে সহযোগিতার পথে এগোচ্ছে। সিএমইআরআই-এর প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও গবেষণার সাহায্যে বায়োগ্যাস উৎপাদনের উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল, গ্রামগুলিতে স্থানীয়ভাবে পাওয়া গোবর এবং জৈব বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে গবাদি পশুর গোবর, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং কৃষিজ বর্জ্য নানা জায়গায় জমে থাকে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে তা থেকে দুর্গন্ধ, দূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বায়োগ্যাস প্রকল্পের মাধ্যমে সেই বর্জ্যকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা যাবে।
প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে এই ব্যবস্থার বিষয়ে সচেতন করাও জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, শুধু প্ল্যান্ট তৈরি করলেই হবে না। তা নিয়মিত চালানো, গোবর সংগ্রহ করা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদিত গ্যাসের সঠিক ব্যবহার—সবকিছু সম্পর্কে স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
## গ্রামবাংলায় কমতে পারে LPG-র নির্ভরতা
গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবার এখনও রান্নার জন্য LPG সিলিন্ডার, কাঠ, কয়লা বা অন্যান্য জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। LPG-এর দাম, সরবরাহ এবং পরিবহণের সমস্যার কারণে অনেক পরিবারকে বাড়তি খরচ করতে হয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় সিলিন্ডার পৌঁছতে সময় লাগে এবং পরিবহণ খরচও বেশি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বাড়ি বা গ্রামভিত্তিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি হলে স্থানীয়ভাবে রান্নার জ্বালানি পাওয়া সম্ভব হবে। যেসব পরিবারে গবাদি পশু রয়েছে, তারা নিজেদের গোবর ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করতে পারবে। আবার কোনও গ্রামে একসঙ্গে একটি কমিউনিটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি হলে একাধিক পরিবারও সেই গ্যাস ব্যবহার করতে পারে।
এর ফলে LPG-এর উপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। তবে বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য নিয়মিত কাঁচামাল, জল, উপযুক্ত জায়গা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তাই প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রকল্পের ধরন নির্ধারণ করতে হবে।
## জৈব সার উৎপাদনেও সুবিধা
বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে গোবর ব্যবহারের পর যে স্লারি বা অবশিষ্ট জৈব পদার্থ পাওয়া যায়, তা কৃষিকাজে কাজে লাগানো যায়। এই পদার্থে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ফলে কৃষকরা রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহার করার সুযোগ পাবেন।
গ্রামবাংলার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকদের সার কেনার খরচ কমতে পারে। একইসঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও জৈব সারের ভূমিকা রয়েছে। গোবরকে শুধু বর্জ্য হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করলে কৃষি ও জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রেই লাভবান হওয়া সম্ভব।
বায়োগ্যাস প্রকল্পের সঙ্গে জৈব সার উৎপাদন যুক্ত থাকলে তা স্থানীয়ভাবে একটি ছোট অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করতে পারে। গবাদি পশুর গোবর সংগ্রহ, প্ল্যান্ট পরিচালনা, গ্যাস সরবরাহ এবং জৈব সার বিক্রির মাধ্যমে গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
## মহিলাদের উপর কমতে পারে জ্বালানি সংগ্রহের চাপ
গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবারে রান্নার জ্বালানি সংগ্রহের দায়িত্ব মহিলাদের উপর থাকে। কাঠ, শুকনো পাতা বা অন্যান্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে তাঁদের অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়লে সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
পরিষ্কার জ্বালানি ব্যবহারের ফলে রান্নাঘরে ধোঁয়ার পরিমাণও কমতে পারে। কাঠ বা কয়লা পোড়ানোর সময় যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তা দীর্ঘদিন শ্বাসের সঙ্গে শরীরে গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বায়োগ্যাস তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার জ্বালানি হওয়ায় রান্নাঘরের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।
তবে বায়োগ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার নিয়ম মানা জরুরি। গ্যাস লিকেজ, পাইপলাইনের সমস্যা এবং প্ল্যান্টের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে হবে।
## পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
গোবর ও জৈব বর্জ্য খোলা জায়গায় পড়ে থাকলে তা থেকে মিথেন-সহ বিভিন্ন গ্যাস নির্গত হতে পারে। আবার বর্জ্য পচে জল ও মাটিও দূষিত হতে পারে। বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে এই বর্জ্যকে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হলে দূষণের মাত্রা কমানো সম্ভব।
বায়োগ্যাস উৎপাদন জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবেও কাজ করতে পারে। কয়লা, কাঠ বা LPG-এর বদলে স্থানীয়ভাবে তৈরি বায়োগ্যাস ব্যবহার করলে জ্বালানি পরিবহণের প্রয়োজন কমে। এতে গ্রামাঞ্চলে শক্তি ব্যবস্থার উপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।
দেশজুড়ে জৈব বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরির উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রের GOBARdhan প্রকল্পের লক্ষ্যও গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বায়োগ্যাস, কমপ্রেসড বায়োগ্যাস এবং জৈব সার উৎপাদন বাড়ানো। বাংলায় নতুন উদ্যোগ সেই বৃহত্তর পরিচ্ছন্ন শক্তি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
## বাস্তবায়নে কী কী চ্যালেঞ্জ?
বায়োগ্যাস প্রকল্পের সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবে তা সফল করতে কিছু সমস্যার সমাধান জরুরি। প্রথমত, নিয়মিত গোবর সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্ল্যান্ট চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী প্রয়োজন। তৃতীয়ত, গ্যাসের পাইপলাইন, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে।
অনেক সময় প্রকল্প তৈরি হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। তাই স্থানীয় পঞ্চায়েত, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, কৃষক সংগঠন এবং গ্রামবাসীদের যুক্ত করে প্রকল্প পরিচালনা করা দরকার। যাঁরা গোবর সরবরাহ করবেন, তাঁদের জন্য উপযুক্ত উৎসাহ বা আর্থিক সুবিধার ব্যবস্থা থাকলে প্রকল্প আরও কার্যকর হতে পারে।
এছাড়া প্রত্যেক গ্রামে গবাদি পশুর সংখ্যা, জমির পরিমাণ, জ্বালানির চাহিদা এবং স্থানীয় মানুষের আগ্রহ একরকম নয়। তাই সব জায়গায় একই ধরনের প্ল্যান্ট না বসিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট, মাঝারি বা কমিউনিটি প্ল্যান্ট তৈরি করা যেতে পারে।
## গ্রামবাংলায় নতুন সম্ভাবনা
গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের এই উদ্যোগ সফল হলে গ্রামবাংলায় বিকল্প শক্তির নতুন দরজা খুলতে পারে। রান্নার জ্বালানি, জৈব সার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান—একাধিক ক্ষেত্রে এর সুফল পাওয়া সম্ভব।
তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তি, অর্থ বরাদ্দ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের উপর। শুধু সরকারি উদ্যোগে প্ল্যান্ট তৈরি করলেই হবে না, তা দীর্ঘদিন কার্যকর রাখার জন্য স্থানীয় স্তরে দায়িত্ব বণ্টন ও নজরদারি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, গোবরকে বর্জ্য না ভেবে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার পথে বাংলার এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে পরিষ্কার জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশ রক্ষাতেও এই প্রকল্প নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।


