ভারতের কিংবদন্তি বক্সার মেরি কমকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘বিগ বস ২০’-এর ঘরে মহিলা ক্রীড়াবিদদের নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত মেরি কমের টিমের তরফে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে জানানো হয়েছে, মেরি কমের বক্তব্যের উদ্দেশ্য কোনও মহিলা ক্রীড়াবিদকে ছোট করা বা অসম্মান করা ছিল না।
মেরি কমের মন্তব্যে টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা এবং ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় সাইনা নেহওয়ালের নাম উঠে আসে। এই দুই ক্রীড়াবিদই ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্রে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ফলে তাঁদের সঙ্গে তুলনা টেনে মেরি কমের বক্তব্যকে অনেকেই অহংকারপূর্ণ এবং অসম্মানজনক বলে মনে করেছেন। যদিও মেরি কমের টিমের দাবি, বক্তব্যটি প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
## কী মন্তব্য করেছিলেন মেরি কম?
‘বিগ বস ২০’-এর একটি পর্বে ক়াজি তৌকিরের সঙ্গে কথোপকথনের সময় মেরি কম নিজের ক্রীড়াজীবন এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য নিয়ে কথা বলছিলেন। সেই আলোচনার মধ্যেই তিনি মহিলা ক্রীড়াবিদদের প্রসঙ্গ তোলেন। কথোপকথনে সানিয়া মির্জা ও সাইনা নেহওয়ালের নামও উঠে আসে।
মেরি কমের বক্তব্যের একটি অংশ দর্শকদের একাংশের কাছে এমনভাবে ধরা পড়ে, যেন তিনি নিজের সাফল্যকে অন্য মহিলা ক্রীড়াবিদদের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করছেন। বিশেষ করে, কে দেশের জন্য কতটা সাফল্য এনেছেন বা কার অর্জন কতটা বড়—এই ধরনের তুলনামূলক বক্তব্য নিয়েই আপত্তি ওঠে।
যদিও অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ কথোপকথন এবং বক্তব্যের প্রেক্ষাপট নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ছোট ভিডিও ক্লিপ থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। অনেকেই মনে করেন, দেশের হয়ে যাঁরা খেলেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের অবদান আলাদা এবং কোনও একজনের সাফল্যকে অন্যের চেয়ে ছোট করে দেখা উচিত নয়।
## সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া
মেরি কমের বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই নেটমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেক দর্শক সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, একজন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ক্রীড়াবিদ হিসেবে মেরি কমের কাছ থেকে এই ধরনের মন্তব্য কেন এল। কেউ কেউ বলেন, মেরি কম নিজে যেমন দেশের হয়ে গৌরব অর্জন করেছেন, তেমনই সানিয়া মির্জা ও সাইনা নেহওয়ালও আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন।
সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্যকে কখনওই একমাত্র মানদণ্ডে বিচার করা যায় না। বক্সিং, টেনিস এবং ব্যাডমিন্টন—প্রতিটি খেলায় সাফল্যের পথ আলাদা। প্রতিটি খেলোয়াড়কে নিজের খেলাধুলার ধরন, প্রতিযোগিতা, সময়কাল এবং পরিস্থিতির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হয়।
অনেকেই আরও বলেন, মহিলা ক্রীড়াবিদদের মধ্যে তুলনা তৈরি করার বদলে তাঁদের সম্মিলিত অবদানকে সম্মান করা উচিত। কারণ, ভারতীয় মহিলা খেলোয়াড়দের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলেই দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
## মেরি কমের টিমের ক্ষমাপ্রার্থনা
বিতর্ক বাড়তে থাকায় মেরি কমের টিমের তরফে একটি ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, মেরি কমের মন্তব্যের উদ্দেশ্য কোনও ক্রীড়াবিদকে হেয় করা ছিল না। বক্তব্যের মাধ্যমে কারও অবদানকে ছোট করা বা অসম্মান করার চেষ্টা করা হয়নি।
টিমের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা প্রত্যেক ক্রীড়াবিদই সম্মানের যোগ্য। প্রত্যেকটি পদক, প্রতিটি জয় এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক সাফল্য দেশের গর্ব বাড়ায়। তাই মেরি কমের বক্তব্য যদি কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকে, তার জন্য দুঃখপ্রকাশ করা হচ্ছে।
ক্ষমাপ্রার্থনায় মূলত এই বিষয়টিই তুলে ধরা হয়েছে যে, ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের সাফল্যকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেখা উচিত নয়। একজন বক্সার হিসেবে মেরি কমের অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সানিয়া মির্জার টেনিসজীবন এবং সাইনা নেহওয়ালের ব্যাডমিন্টনজীবনের অবদানও সমানভাবে মূল্যবান।
## সানিয়া ও সাইনার ক্রীড়া অবদান
সানিয়া মির্জা ভারতীয় টেনিসের অন্যতম সফল মুখ। একক ও দ্বৈত—দুই বিভাগেই তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন। বিশেষ করে ডাবলসে তাঁর সাফল্য ভারতীয় টেনিসকে বিশ্বমঞ্চে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। একাধিক গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় এবং দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখা তাঁর কেরিয়ারের উল্লেখযোগ্য দিক।
অন্যদিকে সাইনা নেহওয়াল ভারতীয় ব্যাডমিন্টনের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। অলিম্পিক পদক, বিশ্বমঞ্চে সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে ওঠার মতো নজির রয়েছে তাঁর। ভারতীয় মহিলা ব্যাডমিন্টনকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও সাইনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই এই দুই ক্রীড়াবিদের নাম নিয়ে কোনও তুলনামূলক মন্তব্য সামনে এলে তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন ক্রীড়াপ্রেমীদের একাংশ। তাঁদের মতে, তিনজনই নিজেদের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক। তাঁদের সাফল্যকে তুলনা না করে সম্মানের সঙ্গে দেখা উচিত।
## বিগ বসের ঘরে মেরি কমের নতুন অধ্যায়
বক্সিং রিংয়ে দীর্ঘ সাফল্যের পর মেরি কম এবার ‘বিগ বস ২০’-এর মতো রিয়্যালিটি শোয়ে অংশ নিয়েছেন। ছয়বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং অলিম্পিক পদকজয়ী এই বক্সারকে এতদিন মূলত ক্রীড়াক্ষেত্রের মানুষ হিসেবেই দেখেছেন দর্শকরা। কিন্তু বিগ বসের ঘরে তাঁর ব্যক্তিত্ব, মতামত এবং আবেগের অন্য দিক সামনে আসছে।
শোয়ে প্রবেশের আগে মেরি কম জানিয়েছিলেন, তিনি কোনও নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি নিয়ে বিগ বসের ঘরে যাচ্ছেন না। নিজের মতো করে থাকতে এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান তিনি। তবে রিয়্যালিটি শোয়ের পরিবেশে প্রতিটি মন্তব্য দ্রুত দর্শকদের নজরে আসে। ফলে ছোট কথোপকথনও কখনও কখনও বড় বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এর আগেও বিগ বসের ঘরে মেরি কমকে মণিপুরের পরিস্থিতি নিয়ে আবেগপ্রবণ হতে দেখা গিয়েছে। নিজের রাজ্যের মানুষের কষ্ট এবং অশান্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি অসহায়তার কথা জানিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যে দর্শকদের একাংশ তাঁর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মহিলা ক্রীড়াবিদদের নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্য তাঁকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
## বিতর্ক থেকে কী বার্তা?
এই ঘটনা ফের মনে করিয়ে দিল, জনসমক্ষে পরিচিত ব্যক্তিদের প্রতিটি বক্তব্য কতটা সংবেদনশীল হতে পারে। বিশেষ করে ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা মহিলাদের নিয়ে মন্তব্য করার সময় আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ, মহিলা ক্রীড়াবিদদের দীর্ঘদিন ধরেই নানা সামাজিক বাধা, বৈষম্য এবং তুলনার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
মেরি কমের টিমের ক্ষমাপ্রার্থনার পর বিতর্ক কিছুটা থামবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের প্রতিটি ক্রীড়াবিদের অবদানই গুরুত্বপূর্ণ। বক্সিং, টেনিস, ব্যাডমিন্টন কিংবা অন্য কোনও খেলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশের হয়ে সাফল্য অর্জন করা খেলোয়াড়রা দেশের সম্মান বাড়ান।
তাই কোনও একজনের কৃতিত্বকে তুলে ধরতে গিয়ে অন্য ক্রীড়াবিদের অবদানকে ছোট না করাই শ্রেয়। মেরি কমের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে বিতর্কের পর তাঁর টিমের পক্ষ থেকে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তার মূল কথাও সেটিই—দেশের প্রতিটি পদকই সম্মানের, এবং প্রতিটি ক্রীড়াবিদই দেশের গর্ব।


