লালকেল্লা বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা NIA-এর। তদন্তকারী সংস্থার চার্জশিট অনুযায়ী, আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত তিন চিকিৎসক প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই বিস্ফোরক পরীক্ষার কাজ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁরা ফরিদাবাদের নির্জন এলাকা এবং আরাবল্লি পাহাড়ের জঙ্গলে আইইডি ও আগ্নেয়াস্ত্র পরীক্ষা করেন বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, ধাপে ধাপে এই কার্যকলাপ আরও গোপন ও পরিকল্পিত হয়ে ওঠে।
### বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই প্রথম বিস্ফোরক পরীক্ষা?
NIA-এর চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, তথাকথিত ‘হোয়াইট-কোট টেরর মডিউল’-এর সদস্যরা প্রথমে আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেই বিস্ফোরক পরীক্ষার কাজ চালিয়েছিলেন। চিকিৎসক পেশার আড়ালে তাঁরা বিস্ফোরক তৈরির প্রক্রিয়া ও তার কার্যকারিতা যাচাই করছিলেন বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পর খোলা মাঠ এবং অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গা বেছে নেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। পরে আরাবল্লি পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে গিয়ে বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র পরীক্ষা করা হয়েছিল বলে চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝা যায়, অভিযুক্তরা ধীরে ধীরে নিজেদের কার্যকলাপ আরও গোপন করার চেষ্টা করেছিলেন।
### আরাবল্লির জঙ্গলে আইইডি ও বন্দুক পরীক্ষা
NIA-এর তদন্ত অনুযায়ী, আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত তিন চিকিৎসক ফরিদাবাদের বিভিন্ন নির্জন এলাকা এবং আরাবল্লি জঙ্গলে ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস বা আইইডি পরীক্ষা করেছিলেন। পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রের কার্যকারিতাও যাচাই করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, এই পরীক্ষা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বরং একটি বড়সড় নাশকতার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই বিস্ফোরক এবং অস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। চার্জশিটে এই কর্মকাণ্ডকে একটি সংগঠিত সন্ত্রাসবাদী মডিউলের পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এই সমস্ত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
### ‘হোয়াইট-কোট টেরর মডিউল’ বলতে কী?
তদন্তে উঠে আসা এই মডিউলকে ‘হোয়াইট-কোট টেরর মডিউল’ বলা হচ্ছে, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজনদের মধ্যে চিকিৎসক বা চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নাম রয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসক পেশা বিশ্বাস ও সেবার প্রতীক। সেই পেশার আড়াল ব্যবহার করে যদি কেউ নাশকতার পরিকল্পনা করে থাকে, তা হলে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
NIA-এর দাবি, অভিযুক্তরা তাঁদের পেশাগত পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিস্ফোরক ও অস্ত্র সংক্রান্ত কার্যকলাপ চালিয়েছিলেন। যদিও কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে দোষী বলা যায় না। তদন্তের নথি, প্রমাণ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
### লালকেল্লা বিস্ফোরণের সঙ্গে যোগসূত্র
এই তদন্তের সূত্র ধরেই লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। NIA-এর চার্জশিট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর লালকেল্লার কাছে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের আগে এই মডিউল বিস্ফোরক ও অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ।
ওই বিস্ফোরণে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে তদন্ত সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিস্ফোরণের পর থেকেই তদন্তকারীরা বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সন্ধান করছিলেন। সেই তদন্তেই আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন চিকিৎসকের নাম উঠে আসে। তাঁদের কার্যকলাপ, যোগাযোগ এবং বিস্ফোরক পরীক্ষার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয় বলে জানা গিয়েছে।
### অস্ত্র কেনার জন্য অর্থ জোগাড়ের অভিযোগ
চার্জশিট সংক্রান্ত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, এই মডিউল অস্ত্র কেনার জন্য প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা জোগাড় করেছিল। বিস্ফোরক এবং আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সেগুলি পরীক্ষা করার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, অর্থের জোগান, অস্ত্র সংগ্রহ এবং পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ—সবকিছু মিলিয়ে একটি সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক কাজ করছিল। তবে অর্থের উৎস, কারা অর্থ দিয়েছিল এবং অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে কারা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল, তা নিয়ে তদন্ত এখনও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে।
### জাসির বিলাল ওয়ানির নামও চার্জশিটে
এই মামলায় জাসির বিলাল ওয়ানির নামও উঠে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, তিনি ওই মডিউলকে সাহায্য করেছিলেন। তাঁকে বেশি বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
তবে তাঁর ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তিনি কীভাবে মডিউলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে—সেসব বিষয় আদালতে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হবে। চার্জশিটে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
### বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে আগেও প্রশ্ন উঠেছিল
আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এর আগেও নানা অভিযোগ সামনে এসেছিল। বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, প্রশাসনিক কার্যকলাপ এবং কিছু আর্থিক অনিয়ম নিয়েও তদন্ত চলেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের নাম সন্ত্রাসবাদী তদন্তে উঠে আসার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে কর্মরত ব্যক্তিদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, পেশাগত যাচাই এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই গোটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না। তদন্তে ব্যক্তিগত ভূমিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়—দুই বিষয়ই আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
### তদন্তে আরও তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা
NIA-এর চার্জশিটে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বিস্ফোরক পরীক্ষা থেকে আরাবল্লির জঙ্গলে অস্ত্র পরীক্ষার যে ধারাবাহিকতার কথা বলা হয়েছে, তা তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্তকারীরা এখন এই মডিউলের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তি, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং সম্ভাব্য যোগাযোগের নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখছেন।
লালকেল্লা বিস্ফোরণের আগে কতদিন ধরে এই প্রস্তুতি চলছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে কারা বিষয়টি জানতেন এবং পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণে ব্যবহৃত সামগ্রী কোথা থেকে এসেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা।
সব মিলিয়ে, আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বোমা ও অস্ত্র পরীক্ষার যে অভিযোগ NIA-এর চার্জশিটে উঠে এসেছে, তা লালকেল্লা বিস্ফোরণ মামলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে আরাবল্লির জঙ্গল পর্যন্ত পরীক্ষামূলক কার্যকলাপের এই অভিযোগ নিরাপত্তা সংস্থাগুলির নজর আরও বাড়িয়েছে। তবে তদন্তের সমস্ত দাবি এখনও আদালতে বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা জরুরি।


