ইংল্যান্ডের কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ফের নজর কাড়লেন ভারতীয় বাঁহাতি স্পিনার রবি সাই কিশোর। গ্লস্টারশায়ারের হয়ে দুরন্ত বোলিং করে ডার্বিশায়ারের বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট তুলে নিলেন তিনি। তাঁর অসাধারণ বোলিংয়ের সৌজন্যে ম্যাচে বড় জয় পেল গ্লস্টারশায়ার। ব্রিস্টলের সিট ইউনিক স্টেডিয়ামে আয়োজিত ডিভিশন টু-এর ম্যাচে ডার্বিশায়ারকে ২১৩ রানে হারিয়েছে গ্লস্টারশায়ার। দলের জয়ে ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন জেমস ব্রেসি এবং মাইলস হ্যামন্ডও। তবে ম্যাচের শেষ দিনে বল হাতে সাই কিশোরের দাপটই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
### পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন সাই
ডার্বিশায়ারের দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে কার্যত তাণ্ডব চালান সাই কিশোর। মাত্র ২০ রান খরচ করে পাঁচটি উইকেট তুলে নেন তিনি। তাঁর স্পিনের সামনে ডার্বিশায়ারের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০৫ রানে অলআউট হয়ে যায় ডার্বিশায়ার। ফলে বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে গ্লস্টারশায়ার।
ইংল্যান্ডের পরিবেশে স্পিনারদের জন্য পরিস্থিতি সবসময় সহজ হয় না। সাধারণত কাউন্টি ক্রিকেটে পেসারদের সাহায্য করে পিচ ও আবহাওয়া। কিন্তু সাই কিশোর নিজের নিয়ন্ত্রিত বোলিং, সঠিক লাইন-লেন্থ এবং ব্যাটারদের উপর চাপ তৈরি করার ক্ষমতা দিয়ে প্রমাণ করলেন, বিদেশের মাটিতেও ভারতীয় স্পিনাররা কার্যকর হতে পারেন। তাঁর পাঁচ উইকেট গ্লস্টারশায়ারের জয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
### ২১৩ রানে ডার্বিশায়ারকে হারাল গ্লস্টারশায়ার
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য গ্লস্টারশায়ারের জন্য একেবারেই ভালো হয়নি। প্রথম দিনেই মাত্র ৩৭ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় দল। সেখান থেকে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর কাজ শুরু করেন জেমস ব্রেসি এবং মাইলস হ্যামন্ড।
দু’জনেই দুর্দান্ত শতরান করেন। তাঁদের ব্যাটিংয়ের সুবাদে প্রাথমিক বিপর্যয় সামলে বড় রানের ভিত তৈরি করে গ্লস্টারশায়ার। জেমস ব্রেসি উইকেটকিপার-ব্যাটার হিসেবে বিশেষ নজিরও গড়েন। গ্লস্টারশায়ারের হয়ে এক ম্যাচে দু’টি শতরান করা উইকেটকিপারদের তালিকায় দীর্ঘদিন পর তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে বলে ম্যাচ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাটারদের বড় রানের পর বোলাররা দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে সাই কিশোরের পাঁচ উইকেট ডার্বিশায়ারের রান তাড়ার সম্ভাবনা শেষ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২১৩ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জেতে গ্লস্টারশায়ার।
### প্রথম ইনিংসে বিপর্যয় সামলে দারুণ প্রত্যাবর্তন
গ্লস্টারশায়ারের ইনিংসের শুরুতেই একের পর এক উইকেট পড়ায় ম্যাচে ডার্বিশায়ারের দখল তৈরি হয়েছিল। মাত্র ৩৭ রানে পাঁচ উইকেট হারানোর পর মনে হয়েছিল, গ্লস্টারশায়ার হয়তো বড় সমস্যায় পড়তে চলেছে।
কিন্তু জেমস ব্রেসি ও মাইলস হ্যামন্ডের জুটি ম্যাচের চেহারা বদলে দেয়। দু’জনের শতরান দলকে বড় স্কোর গড়তে সাহায্য করে। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিং শুধু ইনিংসকে স্থিতিশীল করেনি, বরং ডার্বিশায়ারের উপর পালটা চাপও তৈরি করেছে।
চার দিনের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এমন প্রত্যাবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে দ্রুত উইকেট হারানোর পর দলকে ঘুরে দাঁড় করাতে বড় জুটি প্রয়োজন হয়। গ্লস্টারশায়ারের ক্ষেত্রে সেই কাজটাই করেছেন ব্রেসি ও হ্যামন্ড। এরপর বোলাররা সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।
### ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতীয় স্পিনারের সাফল্য
ভারতীয় ক্রিকেটে সাই কিশোর মূলত বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনার হিসেবে পরিচিত। ঘরোয়া ক্রিকেটে তামিলনাড়ুর হয়ে নিয়মিত সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি আইপিএলেও তিনি গুজরাট টাইটান্সের হয়ে খেলেছেন। ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেটেও তাঁর অভিষেক হয়েছে।
তবে বিদেশের মাটিতে কাউন্টি ক্রিকেট খেলে অভিজ্ঞতা অর্জন তাঁর ক্রিকেটজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ইংল্যান্ডের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার ফলে সাই কিশোরকে ভিন্ন ধরনের পরিবেশ, ব্যাটিং কৌশল এবং পিচের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
কাউন্টি ক্রিকেটে দীর্ঘ স্পেলে বোলিং করার সুযোগ থাকে। ফলে স্পিনারদের শুধু উইকেট নেওয়া নয়, রান আটকানো এবং ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডার্বিশায়ারের বিরুদ্ধে সাই কিশোর সেই দায়িত্বই সফলভাবে পালন করেছেন।
### গ্লস্টারশায়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জয়
ডিভিশন টু-এর লড়াইয়ে গ্লস্টারশায়ারের এই জয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মরশুমের শুরুতে দলের পারফরম্যান্স খুব একটা ধারাবাহিক ছিল না। ডার্বিশায়ারের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে জয় তাই আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি পয়েন্ট তালিকাতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই দলীয় পারফরম্যান্স দেখা গিয়েছে এই ম্যাচে। প্রথম ইনিংসে ব্রেসি ও হ্যামন্ডের শতরান এবং দ্বিতীয় ইনিংসে সাই কিশোরের পাঁচ উইকেট গ্লস্টারশায়ারকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে।
ম্যাচের এক পর্যায়ে দল ৩৭ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়েছিল। সেখান থেকে ২১৩ রানের জয় তুলে নেওয়া গ্লস্টারশায়ারের লড়াকু মানসিকতারও প্রমাণ।
### সাই কিশোরের জন্য আত্মবিশ্বাসের বড় মুহূর্ত
ভারতীয় ক্রিকেটে স্পিনারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা যথেষ্ট কঠিন। জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের পাশাপাশি বিদেশের পরিবেশেও নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হয়। সাই কিশোরের এই পাঁচ উইকেটের পারফরম্যান্স সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলার ফলে তাঁর বোলিংয়ে বৈচিত্র্য বাড়তে পারে। ব্যাটারদের ফুটওয়ার্ক, পিচের গতি এবং আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাঁকে আরও পরিণত স্পিনার করে তুলতে পারে।
একইসঙ্গে গ্লস্টারশায়ারের হয়ে নিয়মিত খেলার সুযোগ তাঁর ম্যাচ ফিটনেস এবং দীর্ঘ স্পেলে বোলিং করার দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করবে। ভারতের হয়ে ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
### ম্যাচের নায়ক শুধু সাই নন
যদিও পাঁচ উইকেট নিয়ে সাই কিশোর ম্যাচের অন্যতম প্রধান নায়ক, গ্লস্টারশায়ারের জয়কে একক কৃতিত্ব হিসেবে দেখা যাবে না। জেমস ব্রেসি এবং মাইলস হ্যামন্ডের শতরান দলকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে। তাঁদের ব্যাটিংয়ের উপর দাঁড়িয়েই গ্লস্টারশায়ার ডার্বিশায়ারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পেরেছিল।
এরপর বোলিং বিভাগ সেই চাপ বজায় রাখে। সাই কিশোরের পাশাপাশি দলের অন্যান্য বোলাররাও ডার্বিশায়ারের ব্যাটারদের স্বস্তিতে খেলতে দেননি। শেষ ইনিংসে দ্রুত উইকেট পড়ায় ম্যাচ একেবারে গ্লস্টারশায়ারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
অর্থাৎ এই জয় ছিল সম্মিলিত পারফরম্যান্সের ফল। তবে সাই কিশোরের পাঁচ উইকেট সেই পারফরম্যান্সকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
### কাউন্টিতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের গুরুত্ব বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটারদের কাউন্টি ক্রিকেটে অংশগ্রহণ বেড়েছে। বিদেশের মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলে ভারতীয় ক্রিকেটাররা যেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন, তেমনই ইংল্যান্ডের ঘরোয়া দলগুলিও তাঁদের দক্ষতা থেকে উপকৃত হচ্ছে।
বিশেষ করে স্পিনারদের ক্ষেত্রে কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডের পিচে স্পিনের ব্যবহার, ফিল্ড সেটিং এবং দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাটারদের চাপে রাখার কৌশল ভারতীয় বোলারদের জন্য আলাদা শিক্ষার জায়গা তৈরি করে।
সাই কিশোরের এই পারফরম্যান্স তাই শুধু একটি ম্যাচের পরিসংখ্যান নয়। এটি বিদেশের মাটিতে ভারতীয় স্পিনের কার্যকারিতারও উদাহরণ। ভবিষ্যতে আরও ভারতীয় ক্রিকেটার কাউন্টি ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পেলে তাঁদের আন্তর্জাতিক প্রস্তুতিও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ডার্বিশায়ারের বিরুদ্ধে গ্লস্টারশায়ারের ২১৩ রানের জয় ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্যও সুখবর। দলের জয়ে জেমস ব্রেসি ও মাইলস হ্যামন্ডের শতরানের পাশাপাশি রবি সাই কিশোরের পাঁচ উইকেট বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। মাত্র ২০ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, ইংল্যান্ডের মাটিতেও তাঁর স্পিন কতটা কার্যকর হতে পারে। কাউন্টি ক্রিকেটে এই সাফল্য সাই কিশোরের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে এবং ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও আরও উজ্জ্বল করবে।


