পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতায় নাবালিকা স্ত্রীর সন্তান প্রসবের পর গ্রেপ্তার হলেন তাঁর স্বামী। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই কিশোরীর বয়স ১৭ বছর। প্রায় এক বছর আগে গড়বেতার বাসিন্দা রাহুল মণ্ডল নামে এক যুবকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল বলে অভিযোগ। সম্প্রতি প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে তাঁকে চন্দ্রকোনা রোডের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হয়। সেখানেই সন্তানের জন্ম দেন নাবালিকা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে জানালে তদন্ত শুরু হয় এবং এরপরই তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
### নার্সিংহোম থেকেই পুলিশের কাছে খবর
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকদিন আগে প্রসবযন্ত্রণা শুরু হলে ওই নাবালিকাকে চন্দ্রকোনা রোডের একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সেখানেই তাঁর প্রসব হয়। পরে নাবালিকার বয়স সংক্রান্ত তথ্য সামনে আসতেই বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে থানায় খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ নার্সিংহোমে পৌঁছয়। নাবালিকার বয়স, বিয়ের বিষয় এবং গোটা ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তের পর তাঁর স্বামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনাটি সামনে আসার পর ফের একবার রাজ্যে বাল্যবিবাহ এবং নাবালিকাদের গর্ভধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
### বিয়ের এক বছরের মধ্যেই সন্তান
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে গড়বেতার বাসিন্দা ওই যুবকের সঙ্গে নাবালিকার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের সময় কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম ছিল বলে অভিযোগ। পরবর্তীকালে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।
আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি মেয়ের বিয়ে বাল্যবিবাহের আওতায় পড়ে। ফলে এমন বিয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইসঙ্গে ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে POCSO আইনের বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। এই কারণেই নাবালিকার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে—এই যুক্তি অভিযুক্তকে আইনি দায় থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত করে না।
### বাল্যবিবাহ রুখতে কড়া বার্তা রাজ্যের
গড়বেতার এই ঘটনা এমন একটি সময়ে সামনে এল, যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাবালিকা বিয়ে এবং অল্পবয়সে গর্ভধারণের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ১৮ বছরের নিচে বিয়ে বা নাবালিকাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাল্যবিবাহে জড়িত ব্যক্তি, পরিবার বা সহযোগীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সরকারের তরফে আরও জানানো হয়েছে, নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করতে বাড়ি বাড়ি নজরদারি এবং তথ্য সংগ্রহের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একইসঙ্গে এমন ঘটনায় জড়িতদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
### নাবালিকা গর্ভধারণে বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
অল্প বয়সে গর্ভধারণ শুধুমাত্র আইনি সমস্যা নয়, এর সঙ্গে কিশোরীর স্বাস্থ্য এবং সদ্যোজাতের নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। কৈশোরে শরীর এখনও সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্তবয়স্ক গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত না থাকায় গর্ভাবস্থা ও প্রসবের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতার ঝুঁকি থাকতে পারে।
তাই বাল্যবিবাহ রোধের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ নয়, কিশোরীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনও নাবালিকা গর্ভবতী হলে তার পরিচয় প্রকাশ না করে দ্রুত চিকিৎসা ও সরকারি শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।
### পরিচয় গোপন রাখার গুরুত্ব
নাবালিকা এবং তাঁর সদ্যোজাত সন্তানকে ঘিরে এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তাঁদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা। শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত মামলায় নাবালিকার নাম, ছবি বা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় সহজে শনাক্ত করা যায়।
গড়বেতার ঘটনাতেও নাবালিকার পরিচয় প্রকাশ না করে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই পুলিশের সামনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পাশাপাশি সদ্যোজাত এবং কিশোরী মায়ের চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
### বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি
গড়বেতায় সন্তান প্রসবের পর নাবালিকার বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি নাবালিকার বিয়ে হওয়ার পর প্রায় এক বছর কেটে যাওয়ার পর বিষয়টি সামনে এসেছে হাসপাতালের মাধ্যমে। ফলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় স্তরে নজরদারি কতটা কার্যকর, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক কড়া অবস্থানের পর এমন ঘটনায় দ্রুত গ্রেপ্তারি প্রশাসনের বার্তাকে স্পষ্ট করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, স্কুল, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
গড়বেতার ঘটনায় আপাতত নাবালিকার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ-সহ একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের সময় নাবালিকার বয়স, বিয়েতে কারা যুক্ত ছিলেন এবং ঘটনার সঙ্গে আর কারও ভূমিকা ছিল কি না—সেই বিষয়গুলিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।


