দুর্গাপুজোর আগে রাজ্যের জুট মিল শ্রমিকদের জন্য বড় বার্তা দিলেন শ্রমমন্ত্রী অর্জুন সিং। শ্রমিকদের পুজোর বোনাস নিয়ে সেপ্টেম্বর মাসেই ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন তিনি। জুট শিল্পকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সমস্যা, বন্ধ হয়ে যাওয়া মিল এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান—সবকিছুর মধ্যেই এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
জুট শিল্পকে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে শ্রমিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেছেন অর্জুন। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে একাধিক বন্ধ জুট মিল ফের চালু হয়েছে বলে সরকারি ও রাজনৈতিক মহলে দাবি করা হয়েছে।
## সেপ্টেম্বরে বোনাস দেওয়ার উদ্যোগ
পুজোর আগে শ্রমিকদের হাতে যাতে বোনাস পৌঁছে যায়, সেই লক্ষ্যেই সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিষয়টি মেটানোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। জুট মিল শ্রমিকদের কাছে পুজোর বোনাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উৎসবের মরশুমে পরিবারের অতিরিক্ত খরচ সামলাতে এই অর্থের উপর বহু শ্রমিক পরিবার নির্ভর করে।
অর্জুন সিংয়ের বক্তব্যে তাই শুধু শিল্পের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়, শ্রমিক কল্যাণকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতার বিষয়টি সামনে রেখেই রাজ্য সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।
## একের পর এক জুট মিল খোলার দাবি
পশ্চিমবঙ্গের জুট শিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে মিল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে নতুন সরকারের আমলে বেশ কয়েকটি বন্ধ মিল ফের উৎপাদনে ফিরেছে বলে সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৪টি বন্ধ জুট মিল পুনরায় চালু হওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
জুট শিল্পের এই পুনরুজ্জীবনকে রাজ্য সরকার নিজেদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। শিল্প চালু থাকলে একদিকে যেমন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে পাটচাষিরাও তাঁদের উৎপাদিত কাঁচা পাটের বাজার পান।
## বাংলাকে ‘গুজরাট’ করার ডাক অর্জুনের
শ্রমিক ও জুট শিল্পের প্রসঙ্গেই বাংলার শিল্পায়ন নিয়ে আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন অর্জুন সিং। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গকে এমন একটি শিল্পবান্ধব রাজ্যে পরিণত করতে হবে যেখানে নতুন বিনিয়োগ আসবে, শিল্প তৈরি হবে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে।
এই প্রসঙ্গে গুজরাট মডেলের উল্লেখ করে বাংলাকে শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল—শিল্পের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা কারখানাগুলিকে ফের উৎপাদনের আওতায় আনা।
তবে ‘গুজরাট মডেল’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ নিয়ে শাসক ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে অর্জুনের এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ।
## কেন্দ্রের কাছেও জুট শিল্প নিয়ে সওয়াল
শুধু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উদ্যোগ নয়, জুট শিল্পের জন্য কেন্দ্রের কাছেও একাধিক দাবি জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২৬-২৭ জুট বছরের জন্য খাদ্যশস্যের প্যাকেজিংয়ে ১০০ শতাংশ এবং চিনির প্যাকেজিংয়ে ৪০ শতাংশ জুট ব্যাগ ব্যবহারের দাবি জানানো হয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে উঠে এসেছে।
আগস্টের ৫ তারিখ নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৩৪তম Standing Advisory Committee বা SAC বৈঠকে রাজ্যের পক্ষ থেকে এই দাবি তোলা হয়। রাজ্যের বক্তব্য ছিল, খাদ্যশস্যের জন্য জুট প্যাকেজিংয়ের ১০০ শতাংশ সংরক্ষণ এবং চিনির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ বাড়ানো হলে চলতি মরশুমের বেশি পাট উৎপাদন কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
## পাটচাষি থেকে শ্রমিক—পুরো অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত জুট
জুট শিল্পের গুরুত্ব শুধু মিল শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাটচাষি, পরিবহণকর্মী, জুট মিলের শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসা—সব মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে।
রাজ্যের তরফে SAC বৈঠকে বলা হয়েছে, দেশের জুট অর্থনীতি প্রায় ৪০ লক্ষ কৃষক পরিবার এবং ২.৫ লক্ষের বেশি মিল শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ এই শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় রাজ্যের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব যথেষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে মিল চালু রাখা এবং শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা—দুটিই সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবেও জুটকে তুলে ধরা
জুট শিল্পের পক্ষে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি রয়েছে পরিবেশগত দিক থেকে। প্লাস্টিকের পরিবর্তে পাটের ব্যাগ ব্যবহার করা যায় এবং জুট পণ্য জৈবভাবে অবক্ষয়যোগ্য। কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের সওয়ালে এই পরিবেশগত বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
রাজ্যের যুক্তি, জুট প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার কমলে একদিকে পাটচাষি ও জুট মিলের উপর প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে প্লাস্টিক দূষণ কমানোর প্রচেষ্টাও ধাক্কা খেতে পারে। তাই জুট প্যাকেজিংয়ের বাধ্যতামূলক ব্যবহারের নীতি বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছে রাজ্য।
## শ্রমিকদের পুজো, সামনে বড় পরীক্ষা
সেপ্টেম্বরে বোনাস দেওয়ার ঘোষণা জুট মিল শ্রমিকদের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পুজোর বোনাস নয়, নিয়মিত উৎপাদন, সময়মতো বেতন, কাঁচা পাটের জোগান এবং মিলগুলির আর্থিক স্থায়িত্ব—সবকিছুর উপরেই জুট শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
সরকারের দাবি, একাধিক মিল পুনরায় চালু করে ইতিমধ্যেই সেই পথে কাজ শুরু হয়েছে। এখন সেই মিলগুলিতে উৎপাদন কতটা স্থায়ী হয় এবং শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়মিতভাবে নিশ্চিত করা যায় কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অর্জুন সিংয়ের ‘বাংলাকে গুজরাট’ করার ডাক তাই শুধু রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পরীক্ষাও বটে। পুজোর আগে শ্রমিকদের হাতে বোনাস পৌঁছনো সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলির একটি হতে পারে।


