তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ফের উত্তেজনা। বিধানসভায় ডিএমকে নেতা এম কে স্ট্যালিনকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের একটি অঙ্গভঙ্গি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, স্ট্যালিনের জরুরি অবস্থার সময়ের চোয়ালের চোটকে ইঙ্গিত করে তাঁকে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে ডিএমকে-সহ বাম দলগুলিও। সিপিএম নেতা পি শানমুগাম এই আচরণকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে আক্রমণ করেছেন।
### ঠিক কী ঘটেছিল বিধানসভায়?
ঘটনার সূত্রপাত সোমবারের তামিলনাড়ু বিধানসভার অধিবেশন থেকে। ওই দিন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় তাঁর বক্তব্যে ডিএমকের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। বক্তব্যে তিনি ইডির নথির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন ও তাঁর পুত্র, বিরোধী দলনেতা উদয়নিধি স্ট্যালিনকে নিশানা করেন।
বিজয়ের বক্তব্যের প্রতিবাদে ডিএমকে বিধায়করা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। উদয়নিধি স্ট্যালিনকে বক্তব্য রাখার সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিরোধী বিধায়করা বিধানসভার ওয়েলে নেমে প্রতিবাদ করেন এবং পরে ওয়াকআউট করেন। পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরপর বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার সময় বিজয় ডান হাতের তালু চোয়ালের কাছে রাখেন। এই অঙ্গভঙ্গিকেই বিরোধীরা স্ট্যালিনের পুরনো চোয়ালের চোটের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভিডিও ও ছবির সূত্রে বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
### স্ট্যালিনের পুরনো চোট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ের একটি ঘটনা। সিপিএম নেতা পি শানমুগামের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই সময় এম কে স্ট্যালিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি গুরুতরভাবে আক্রান্ত হন। তাঁর চোয়াল ভেঙে যায় বলে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
শানমুগামের দাবি, কারও শারীরিক চেহারা বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উপহাস করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেই কাজ যদি একজন মুখ্যমন্ত্রী করেন, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে বলেই তাঁর বক্তব্য।
### সিপিএমের কড়া সমালোচনা
সিপিএম নেতা পি শানমুগাম প্রকাশ্যেই বিজয়ের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জরুরি অবস্থার সময় গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যে লড়াই হয়েছিল এবং সেই সময় যে দমন-পীড়ন চলেছিল, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে এভাবে ব্যক্তিগত কটাক্ষে ব্যবহার করা উচিত নয়।
বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিজয়ের সরকারকে বাম দলগুলি বাইরে থেকে সমর্থন করছে। সেই সমর্থন সত্ত্বেও শানমুগামের প্রকাশ্য সমালোচনা তামিলনাড়ুর বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
### ডিএমকে-টিভিকে সংঘাত আরও তীব্র
বিজয়ের এই বক্তব্য ও অঙ্গভঙ্গির ঘটনা এমন একটি সময়ে সামনে এল, যখন তামিলনাড়ুতে TVK সরকার এবং ডিএমকের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর দুর্নীতির অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ার প্রতিবাদে ডিএমকে বিধায়কদের বিক্ষোভ এবং ওয়াকআউট পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।
ডিএমকের অভিযোগ, বিধানসভা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার জায়গা নয়। অন্যদিকে বিজয় সরকার ডিএমকের পূর্ববর্তী শাসন ও দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরছে। ফলে বিধানসভার অধিবেশন কার্যত TVK বনাম DMK সংঘাতের নতুন মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
### ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ
সিপিএমের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলের একাংশের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক বিতর্কে নীতিগত ও প্রশাসনিক প্রশ্নই সামনে থাকা উচিত। ব্যক্তিগত চেহারা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা অতীতের আঘাতকে রাজনৈতিক আক্রমণের অংশ করলে বিতর্কের মান নেমে যেতে পারে।
তবে অঙ্গভঙ্গিটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের পক্ষ থেকে আলাদা কোনও ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে এসেছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে। তাই এটি ইচ্ছাকৃতভাবে স্ট্যালিনকে নিয়ে উপহাস ছিল—এমন দাবি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না দেখে বিরোধীদের অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
### বিধানসভায় আরও একাধিক বিতর্ক
এই অধিবেশনেই বিজয় নারীকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বলেন, মহিলাদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর বা অবমাননাকর ভাষা বরদাস্ত করা হবে না এবং আইন নিজের পথে চলবে। এই বক্তব্য সাম্প্রতিক এক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এসেছে।
অর্থাৎ একদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক ভাষায় নিশানা করা, অন্যদিকে নারীদের সম্মান রক্ষার বিষয়ে কঠোর বার্তা—বিজয়ের সাম্প্রতিক বিধানসভা বক্তৃতা ঘিরে দুই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই তৈরি হয়েছে।
### তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সংঘাতের ইঙ্গিত
অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসা বিজয়ের TVK সরকার এখনও নতুন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ডিএমকের সঙ্গে তাঁর দলের সংঘাত ক্রমশ প্রকাশ্য হচ্ছে। বিধানসভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি সেই সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে।
স্ট্যালিনকে ঘিরে অঙ্গভঙ্গির বিতর্ক এখন কতদূর গড়ায়, তা দেখার বিষয়। একইসঙ্গে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিরোধীদের প্রতিবাদ এবং স্পিকারের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে আগামী দিনগুলিতে আরও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।


