কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা তৃণমূলের বিধায়ক ফিরহাদ হাকিমকে ঘিরে ফের চড়ল রাজনৈতিক উত্তাপ। বৃহস্পতিবার নিউ আলিপুরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত দুটি সংস্থার অফিস ও কারখানায় তল্লাশি চালাল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি বিরোধী কমিশনের সদস্যরা। জমি সংক্রান্ত একটি অভিযোগের ভিত্তিতেই এই তল্লাশি বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলে নথিপত্র ও সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ কমিশনের তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল নিউ আলিপুরের টালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে পৌঁছয়। সেখানে **হাকিম পলিমেকার্স প্রাইভেট লিমিটেড** এবং **হাকিম কেমিক্যালস**-এর অফিস ও কারখানা চত্বরে তল্লাশি চালানো হয়। কমিশনের এক সদস্য জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জমি নিয়ে একটি অভিযোগ জমা পড়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই কারখানার শেড যে জমির উপর তৈরি হয়েছে, তার মালিকানা ও ব্যবসায়িক নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে অভিযোগটির সম্পূর্ণ বিবরণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
### কোন দুই সংস্থায় তল্লাশি?
তদন্তকারীদের নজরে থাকা সংস্থা দুটির মধ্যে **হাকিম পলিমেকার্স প্রাইভেট লিমিটেড** প্লাস্টিক ও পলিথিনজাত সামগ্রী উৎপাদন এবং ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইটে ফিরহাদ হাকিমকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে হাকিম কেমিক্যালসের নাম রাজ্যের শিল্প ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নথিতেও রয়েছে। এই দুই সংস্থার ব্যবসা, জমি ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট নথিই তল্লাশির সময় খতিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, কয়েকটি রিপোর্টে ফিরহাদ হাকিমের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি মার্বেল ব্যবসার ইউনিটেও কমিশনের সদস্যরা গিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তদন্তের পরিধি শুধুমাত্র একটি কারখানায় সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই জানা যাচ্ছে।
### জমি নিয়ে ঠিক কী অভিযোগ?
এই তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে কারখানাগুলি যে জমিতে রয়েছে, সেই জমির মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে ওঠা অভিযোগ। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই জমি **জোহরা বেগম ওয়াকফ এস্টেটের** সম্পত্তির অন্তর্গত এবং সেটি বেআইনিভাবে ব্যবহার করে ব্যবসা চালানো হয়েছে। তবে এই অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন এবং কমিশনের পক্ষ থেকে অভিযোগের সমস্ত খুঁটিনাটি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে জমি দখল বা বেআইনি ব্যবহারের অভিযোগকে এই মুহূর্তে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল সংশ্লিষ্ট জমি ও ব্যবসার নথি খতিয়ে দেখা। জমির ব্যবহার কীভাবে শুরু হয়েছিল, ভাড়ার কোনও চুক্তি রয়েছে কি না এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমির মালিকানার সম্পর্ক কী—এই ধরনের প্রশ্নই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
### ফিরহাদের পালটা বক্তব্য
তল্লাশির সময় অবশ্য ফিরহাদ হাকিম বা তাঁর পরিবারের কোনও সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে ঘটনাস্থলে এসে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই অভিযান আসলে **চরিত্রহননের চেষ্টা** ছাড়া আর কিছু নয়।
ফিরহাদ জানান, তিনি ১৯৮৫ সালে বেকার অবস্থায় ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে কারখানা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ব্যবসার পরিধি বাড়ে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি তাঁর নিজস্ব জমি নয়; তিনি ভাড়ায় জায়গা নিয়ে সেখানে ব্যবসা করছেন এবং নিয়মিত ভাড়ার টাকা দিয়ে থাকেন। ভাড়ার চুক্তি ও রসিদ তাঁর কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর প্রশ্ন, একই এলাকায় একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থাকলেও শুধুমাত্র তাঁর সংস্থাকেই কেন নিশানা করা হচ্ছে? তাঁর বক্তব্য, বৈধভাবে ব্যবসা করে উপার্জন করাকে দুর্নীতি বলা যায় না। ফলে তদন্ত কমিশনের অভিযোগের সঙ্গে তিনি সরাসরি দ্বিমত পোষণ করেছেন।
### কী এই দুর্নীতি বিরোধী কমিশন?
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। অবসরপ্রাপ্ত কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি **বিশ্বজিৎ বসু**কে কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। কমিশনের আওতায় শিক্ষা, খাদ্য, পুরসভা, নিয়োগ এবং আমফান-পরবর্তী ত্রাণ সংক্রান্ত অনিয়মের মতো একাধিক অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।
ফিরহাদ হাকিমের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এই তল্লাশি সেই বৃহত্তর তদন্ত প্রক্রিয়ারই অংশ বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে। কমিশনের এক সদস্য জানিয়েছেন, তাঁরা যে তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিলেন, তার প্রয়োজনীয় অংশ পেয়েছেন। তবে তদন্তের পরবর্তী ধাপে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
### রাজনৈতিক তরজা আরও বাড়ার সম্ভাবনা
ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে এই তদন্তের ঘটনা এমন সময়ে সামনে এল, যখন রাজ্য রাজনীতিতে তাঁকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্বও যথেষ্ট। একদিকে শাসকপক্ষের সঙ্গে যুক্ত নেতার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সরকারি তদন্ত, অন্যদিকে সেই তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ—দুই পক্ষের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন নজর থাকবে তদন্ত কমিশনের হাতে থাকা নথি থেকে কী তথ্য সামনে আসে তার দিকে। জমির মালিকানা, ভাড়ার নথি এবং সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক কাগজপত্র যাচাইয়ের পর কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপাতত তল্লাশি হয়েছে, অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে—কিন্তু কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।


