তৃণমূল কংগ্রেসে বড়সড় ভাঙনের পর এবার সরাসরি আইনি ও সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জের মুখে ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ। তৃণমূল ছেড়ে Nationalist Citizens Party of India বা **NCPI**-তে যোগ দেওয়া এই সাংসদদের বিরুদ্ধে লোকসভার স্পিকারের কাছে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় সাংসদ পদ খারিজের দাবি জানিয়েছে তৃণমূল। সেই সংক্রান্ত নোটিসের জবাব দেওয়ার জন্য এবার আরও সময় চাইলেন বিদ্রোহী শিবিরের সাংসদরা।
সূত্রের খবর, লোকসভা সচিবালয়ের তরফে ২৬ অগস্ট ২০ জন সাংসদকে নোটিস পাঠানো হয়েছিল। তাতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া সাংসদ পদ খারিজের আবেদনের বিষয়ে তাঁদের জবাব দিতে বলা হয়। প্রাথমিকভাবে তাঁদের হাতে সাত দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে জবাব না দিয়ে এবার প্রায় তিন সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় চেয়েছে NCPI শিবির। NCPI-র লোকসভা ফ্লোর লিডার সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময় চাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।
### কেন ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চায় তৃণমূল?
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের সংঘাত নতুন মাত্রা নেয়। দলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ তৃণমূল থেকে বেরিয়ে NCPI-তে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করেন। পাশাপাশি তাঁরা BJP নেতৃত্বাধীন NDA-কে সমর্থনের কথাও জানান।
এই সিদ্ধান্তের পর তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভা নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারের কাছে ওই সাংসদদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক আবেদন জমা দেন। তৃণমূলের বক্তব্য, দলের টিকিটে নির্বাচিত সাংসদরা অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে কার্যত তৃণমূলের সদস্যপদ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই সংবিধানের **Tenth Schedule বা Anti-Defection Law** অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তৃণমূল আরও দাবি করেছে, শুধু দলীয় অবস্থান পরিবর্তন করলেই কোনও সাংসদ দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতার বাইরে চলে যেতে পারেন না। অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁরা NCPI-তে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হয়েছেন এবং তাঁদের অবস্থান আইনসম্মত। এই দুই দাবির সংঘাতেই এখন নজর লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে।
### সাত দিনের বদলে তিন সপ্তাহ সময় চাইলেন তাঁরা
লোকসভা সচিবালয়ের নোটিস পাওয়ার পর NCPI সাংসদরা বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, এত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্নের জবাব মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই বিস্তারিত আইনি অবস্থান তৈরি করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন।
এই কারণেই স্পিকারের কাছে তিন সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়েছে। NCPI শিবিরের তরফে জানানো হয়েছে, তৃণমূলের অভিযোগের প্রত্যেকটি দিক খতিয়ে দেখে তারপর লিখিত জবাব দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এই মুহূর্তে তড়িঘড়ি কোনও উত্তর না দিয়ে আইনি প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিদ্রোহী শিবির।
### সুপ্রিম কোর্টেও পৌঁছেছে বিষয়টি
২০ সাংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই টানাপোড়েন ইতিমধ্যেই সংসদের গণ্ডি ছাড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে। তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা স্পিকারের কাছে দায়ের করা আবেদনগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন।
আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি শুনতে সম্মত হয় এবং ২০ জন সাংসদকে নোটিস দেওয়া হয়। একইসঙ্গে স্পিকারের সামনে চলা প্রক্রিয়াটিও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই লোকসভা সচিবালয়ের তরফে বিদ্রোহী সাংসদদের কাছে নোটিস যায়। ফলে এখন তাঁদের অতিরিক্ত সময় চাওয়ার বিষয়টি গোটা মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
### ২০ সাংসদের অবস্থান কী?
তৃণমূল ছাড়ার পর ২০ জন সাংসদ NCPI-তে যোগ দেওয়ার ঘোষণা করেন। এর আগে তাঁরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে সংসদে আলাদা আসন এবং পৃথক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছিলেন।
বিদ্রোহী শিবিরের তরফে বলা হয়েছিল, তাঁরা NCPI-তে একীভূত হয়েছেন এবং NDA-কে সমর্থন করবেন। এই পদক্ষেপকে ঘিরে সংসদীয় রাজনীতিতে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়। কারণ ২০ জন সাংসদের এই দলবদল স্বীকৃতি পেলে লোকসভায় NDA-র সংখ্যাগণিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
### আলাদা আসন পেলেও স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন
পরবর্তী সময়ে লোকসভায় ২০ জন বিদ্রোহী TMC সাংসদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়। তবে আলাদা আসন পাওয়ার বিষয়টি তাঁদের NCPI হিসেবে চূড়ান্ত সংসদীয় স্বীকৃতি পাওয়ার সমান নয়।
জুলাই মাসে স্পিকার ওম বিড়লা ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদকে আলাদা আসনে বসার অনুমতি দেন। কিন্তু তাঁদের NCPI সংসদীয় দল হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিষয়টি তখনও বিবেচনাধীন ছিল।
অন্যদিকে তৃণমূল এই পুরো প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছে। দলের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে, যাতে বিদ্রোহী সাংসদদের কোনও আলাদা সুবিধা বা স্বীকৃতি দেওয়ার আগে তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা দলত্যাগের অভিযোগের নিষ্পত্তি করা হয়।
### সামনে কী হতে পারে?
এখন মূল নজর থাকবে ২০ সাংসদের জবাব এবং সেই জবাবের ভিত্তিতে স্পিকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। অতিরিক্ত তিন সপ্তাহ সময়ের আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি সময় দেওয়া হয়, তাহলে বিদ্রোহী সাংসদরা তাঁদের আইনি অবস্থান আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে তৃণমূল দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য আইনি পথে চাপ বাড়াচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র দলীয় ভাঙনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সংসদীয় স্বীকৃতি, দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং সাংসদ পদ বহাল থাকার প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে ২০ জন NCPI সাংসদের ভবিষ্যৎ এখন একাধিক সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁরা কি সাংসদ পদ ধরে রাখতে পারবেন, NCPI হিসেবে তাঁদের অবস্থান কতটা স্বীকৃতি পাবে এবং তৃণমূলের দলত্যাগের অভিযোগের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই এখন রাজনৈতিক মহলের নজরে।


