মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারন ট্রাম্পকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান-সম্পর্কিত একটি হুমকিমূলক ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর ২০ বছর বয়সি ব্যারন আরও গোপনীয় জীবনযাপন করছেন এবং প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি কমেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। মার্কিন Secret Service-ও ওই ভিডিও সম্পর্কে অবগত থাকার কথা নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোনও সম্ভাব্য হুমকি তারা তদন্ত করে।
ব্যারন ট্রাম্প বরাবরই পরিবারের অন্য সদস্যদের তুলনায় অনেকটাই আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন নিয়মিত রাজনৈতিক সভা, প্রচার এবং বিভিন্ন জনসমক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তখন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রকে খুব কমই প্রকাশ্যে দেখা যায়। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এবং ২০২৫ সালে বাবার দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে ব্যারনকে অবশ্য নজরে এসেছিল। কিন্তু তারপর থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।
বর্তমানে ব্যারনের বয়স ২০ বছর। তিনি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কলেজজীবনে তিনি সাধারণ ছাত্রের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করার চেষ্টা করলেও তাঁর পরিচয় এবং পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে নিরাপত্তা বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর চারপাশে Secret Service-এর নিরাপত্তা রয়েছে। সাম্প্রতিক হুমকির খবর প্রকাশ্যে আসার পর সেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতির সূত্রপাত একটি হুমকিমূলক ভিডিওকে কেন্দ্র করে। মার্কিন Secret Service জানিয়েছে, ইরান-সম্পর্কিত একটি ভিডিওতে ব্যারন ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে হুমকির বিষয় উঠে এসেছে। ভিডিওটিতে এমন কিছু স্থান দেখানো হয়েছিল, যেখানে ব্যারনের উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। ভিডিওর শেষাংশে তাঁর বিরুদ্ধে হামলার জন্য অর্থ পুরস্কারের ইঙ্গিতও ছিল বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে সেই অর্থের পরিমাণ ১০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই ধরনের দাবির বিস্তারিত সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
Secret Service-এর মুখপাত্র নেট হেরিং জানিয়েছেন, সংস্থা ভিডিওটির বিষয়ে অবগত এবং তাদের সুরক্ষাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত যে কোনও বিষয় তদন্ত করা হয়। তবে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে না বলেও স্পষ্ট করা হয়েছে। এর ফলে ব্যারনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক কীভাবে বাড়ানো হয়েছে বা তাঁর দৈনন্দিন চলাফেরায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তা নিয়ে সরকারি ভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলিতে দাবি করা হচ্ছে, ব্যারন ইতিমধ্যেই অত্যন্ত সীমিত সামাজিক জীবনযাপন করেন এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে জনসমক্ষে বেরোনোর প্রবণতা আরও কমেছে। *The New York Post*-এর একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অন্য সংবাদমাধ্যমগুলিও তাঁর এই কম-প্রকাশ্য জীবনযাপনের কথা জানিয়েছে। সেখানে তাঁকে প্রায় সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকা এবং সাধারণ জনসমাগম এড়িয়ে চলা ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ব্যারনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে কারণ তাঁর বাবা ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইরান-সম্পর্কিত হুমকির অন্যতম লক্ষ্য। ২০২০ সালে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পর থেকেই ইরানের বিভিন্ন মহল থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক বক্তব্য প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংঘাতের আবহে সেই হুমকির মাত্রা আরও বেড়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপরেই সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়েও বিভিন্ন সময়ে হুমকি প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়েও ইরান-সম্পর্কিত একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছিল বলে *TIME* জানিয়েছে। সেই ভিডিওর শেষাংশে ব্যারনের নাম উল্লেখ করে হুমকির ইঙ্গিত ছিল। ফলে নতুন ভিডিওটি সামনে আসার পর মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও অতীতে ইরানের তরফে নিজের প্রাণনাশের হুমকির কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিদেশ সফর এবং যাতায়াতের নিরাপত্তা নিয়েও অতিরিক্ত সতর্কতার খবর সামনে এসেছে। ফলে পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যকে ঘিরে নতুন হুমকি প্রকাশ্যে আসার পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
তবে ব্যারন ট্রাম্পের জনসমক্ষে কম আসার বিষয়টি শুধুমাত্র সাম্প্রতিক ইরানি হুমকির ফল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ তিনি ছোটবেলা থেকেই তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত জীবন পছন্দ করেন। তাঁর মা মেলানিয়া ট্রাম্পও বরাবরই ছেলের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়ে সতর্ক। প্রেসিডেন্ট পরিবারের অন্যান্য সদস্য যেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, ব্যারন সেখানে পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত জীবনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে ব্যারনকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দেখা গিয়েছিল। সেই সময় তাঁর উচ্চতা, আচরণ এবং রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে উপস্থিতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার বিষয় হয়। এর আগে ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাবার পাশে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। তবে সেই উপস্থিতি নিয়মিত রাজনৈতিক সক্রিয়তায় পরিণত হয়নি।
ব্যারনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও মাঝে মাঝে আলোচনা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে তরুণ প্রজন্মের পছন্দ সম্পর্কে তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে পডকাস্ট ও অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর ক্ষেত্রে ব্যারনের কিছু পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে ট্রাম্প নিজেই দাবি করেছেন। কিন্তু এসবের পরেও ব্যারন নিজে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক ভূমিকা নেওয়া থেকে দূরে থেকেছেন।
এখন ইরান-সম্পর্কিত হুমকির কারণে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট পরিবারের কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি থাকলে Secret Service-এর জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক। তবে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা পরিকল্পনা, চলাফেরার রুট বা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার তথ্য প্রকাশ করা হয় না, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে না পড়ে।
অন্যদিকে, ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চলমান উত্তেজনাও এই ঘটনাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তপ্ত। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টাও চলছে। ফলে এই ধরনের হুমকিমূলক প্রচার পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ব্যারন ট্রাম্পের জনসমক্ষে কম আসার বিষয়টি এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছে। ইরান-সম্পর্কিত হুমকিমূলক ভিডিও সম্পর্কে Secret Service-এর অবগত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও, ব্যারনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঠিক কী পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। তাই তাঁর ‘নিরাপত্তার কারণে গৃহবন্দি’ থাকার মতো কোনও নিশ্চিত দাবি করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুমকির ইতিহাস এবং বর্তমান মার্কিন-ইরান উত্তেজনার কারণে ব্যারনের নিরাপত্তা এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০ বছর বয়সি এই তরুণ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে চান না, বরং নিজের পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই থাকতে আগ্রহী। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও বারবার আন্তর্জাতিক সংবাদে উঠে আসছে। সাম্প্রতিক হুমকির পর সেই নজরদারি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।


