একসময় উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন অঞ্চলের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জঙ্গলজুড়ে নেমে এসেছিল আতঙ্কের অন্ধকার। সূর্য ডোবার আগেই গ্রামবাসীরা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতেন। প্রয়োজন ছাড়া কেউ জঙ্গলের পথে পা রাখতেন না। দল বেঁধে বাইরে বেরোলেও হাতে থাকত মশাল, কারণ আশঙ্কা ছিল যে কোনও মুহূর্তে ঘন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে সেই মানুষখেকো বাঘিনী। স্থানীয়দের কাছে সে শুধু একটি বন্যপ্রাণী ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল এক ভয়ংকর কিংবদন্তি—‘চম্পাওয়াতের মানুষখেকো’ বা ‘শয়তান’।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, এই বাঘিনীর হাতে নেপাল ও ভারতের কুমায়ুন অঞ্চলে মোট ৪৩৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। শেষপর্যন্ত ১৯০৭ সালে কিংবদন্তি শিকারি ও প্রকৃতিবিদ জিম করবেট তাকে গুলি করে হত্যা করেন। পরে এই ঘটনা তাঁর বিখ্যাত বই *Man-Eaters of Kumaon*-এর অন্যতম আলোচিত কাহিনি হয়ে ওঠে।
ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য ভারতের কুমায়ুনে নয়, নেপাল থেকে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, নেপালে থাকাকালীন বাঘিনীটি প্রায় ২০০ মানুষের প্রাণ নিয়েছিল। তাকে থামাতে নেপালের সেনাবাহিনী এবং শিকারিদের একাধিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষপর্যন্ত তাকে ওই অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলে সে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের দিকে চলে আসে। কুমায়ুনের চম্পাওয়াত ও আশপাশের এলাকায় নতুন করে শুরু হয় তার তাণ্ডব।
চম্পাওয়াত অঞ্চলে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। গ্রামবাসীদের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল যে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় থমকে যায়। মানুষ একা জঙ্গলের পথে যেতে ভয় পেতেন। কাঠ, শুকনো পাতা সংগ্রহ কিংবা গবাদি পশুর জন্য খাবার জোগাড়ের মতো দৈনন্দিন কাজও হয়ে উঠেছিল প্রাণের ঝুঁকি। বাঘিনীটি দিনের আলোতেও মানুষকে আক্রমণ করত বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে রাতের পাশাপাশি দিনের বেলাতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন স্থানীয়রা।
বাঘিনীটিকে ধরতে বা হত্যা করতে একাধিক শিকারি চেষ্টা করলেও বিশেষ সাফল্য মেলেনি। তার চলাফেরা ছিল অত্যন্ত সতর্ক। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই সে অদৃশ্য হয়ে যেত জঙ্গলের গভীরে। ফলে একের পর এক চেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে তখন বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে যায় যে এই বাঘিনী সাধারণ বন্যপ্রাণী নয়, বরং কোনও অশুভ শক্তির প্রতীক।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই সামনে আসেন জিম করবেট। ১৯০৭ সালে তাঁকে চম্পাওয়াতের মানুষখেকো বাঘিনীকে থামানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখনও তিনি পরবর্তী জীবনের মতো বিখ্যাত শিকারি হয়ে ওঠেননি। কিন্তু তাঁর সাহস, জঙ্গলের পরিবেশ সম্পর্কে জ্ঞান এবং প্রাণীর গতিবিধি বোঝার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। পরে করবেট তাঁর স্মৃতিকথাধর্মী লেখায় এই শিকারের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
করবেট যখন পালি ও চম্পাওয়াত অঞ্চলে পৌঁছন, তখন তিনি পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখতে পান। গ্রামবাসীরা আতঙ্কে ঘরবন্দি। বাইরে বেরোতে ভয়, অথচ ঘরে খাবারও সীমিত। এমন অবস্থায় করবেট বুঝতে পারেন, দ্রুত কোনও ব্যবস্থা না নিলে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে।
বাঘিনীর পায়ের ছাপ এবং চলাফেরার ধরন দেখে তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন প্রাণীটির বয়স ও শারীরিক অবস্থা। শুরুতে তাঁর ধারণা ছিল, বয়সের কারণে হয়তো বাঘিনী সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু পরে তার শরীর পরীক্ষা করে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে আসে।
করবেটের বর্ণনা অনুযায়ী, বাঘিনীটির চোয়ালের একাধিক দাঁত পুরনো গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। উপরের ও নিচের ক্যানাইন দাঁতের ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক বন্যপ্রাণী শিকার করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে তিনি মনে করেছিলেন। ফলে অপেক্ষাকৃত সহজ শিকার হিসেবে মানুষকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।
এই ঘটনাটি বন্যপ্রাণীর আচরণ বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মানুষখেকো বাঘের ক্ষেত্রে আহত বা অসুস্থ হয়ে পড়া, স্বাভাবিক শিকার ধরতে না পারা এবং মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসার মতো কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। চম্পাওয়াতের বাঘিনীর ক্ষেত্রেও এমন একটি কারণ কাজ করেছিল বলে করবেটের বিবরণ থেকে জানা যায়।
এরপর শুরু হয় শেষ শিকার। করবেট জানতেন, সামান্য ভুলও তাঁর নিজের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। তাই তিনি সরাসরি বাঘিনীর পিছনে না ছুটে অপেক্ষা করার কৌশল নেন। স্থানীয় মানুষদেরও অভিযানের অংশ করা হয়। ঐতিহাসিক বিবরণে জানা যায়, শেষ অভিযানে প্রায় ২৯৮ জন গ্রামবাসীকে নিয়ে একটি ‘বিট’ আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গল থেকে বাঘিনীকে বের করে এমন জায়গায় নিয়ে আসা, যেখানে করবেট তাকে লক্ষ্য করতে পারেন।
শেষপর্যন্ত সেই পরিকল্পনাই সফল হয়। জঙ্গলের আড়াল থেকে বাঘিনী বেরিয়ে আসে। করবেট গুলি চালান। প্রথম গুলির পরও বিপদ পুরোপুরি কাটেনি। বাঘিনী তাঁর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত করবেটের গুলি লক্ষ্যভেদ করে এবং প্রাণীটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ১৯০৭ সালের ১২ মে চম্পাওয়াতের মানুষখেকো বাঘিনীর মৃত্যু ঘটে বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বাঘিনীটি মারা যাওয়ার পর গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের আতঙ্কের অবসান হয়। যে প্রাণীটির নাম শুনলেই মানুষ ঘর থেকে বেরোতে ভয় পেতেন, তার মৃতদেহ সামনে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। করবেটের বিবরণে এমন এক মর্মস্পর্শী মুহূর্তের কথাও রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়া এক তরুণী বাঘিনীটির মৃত্যুর পর আবার কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
এই শিকারের পরই জিম করবেটের নাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিক মানুষখেকো বাঘ ও চিতাবাঘের সন্ধানে অভিযানে অংশ নেন। তবে চম্পাওয়াতের মানুষখেকো বাঘিনী তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিযান হয়ে থাকে। বহু বছর পরে তাঁর লেখা *Man-Eaters of Kumaon* বইয়ে এই কাহিনি প্রকাশিত হলে ঘটনাটি আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। বইটি ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং কুমায়ুনের মানুষখেকো বাঘ-চিতার বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ সেখানে রয়েছে।
আজ সেই ঘটনার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। জিম করবেটের নাম ভারতের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে। যে সময় মানুষখেকো প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিকারের পথই প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচিত হত, সেই সময়ের ঘটনাগুলি আজ অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা হয়। মানুষের নিরাপত্তা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত—সবকিছুর ইতিহাসের সঙ্গে এই কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে।
তবু চম্পাওয়াতের সেই বাঘিনী আজও ইতিহাসের পাতায় আলাদা জায়গা করে আছে। ৪৩৬ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত বলে যে প্রাণীটির কথা বলা হয়, তাকে শেষ পর্যন্ত থামিয়েছিলেন জিম করবেট। একশোরও বেশি বছর পরেও কুমায়ুনের সেই মানুষখেকোর কাহিনি ভয়, বিস্ময় এবং ইতিহাসের এক অদ্ভুত মিশেল হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে।


