দুর্গাপুজো শেষ হতেই কলকাতা পুরসভা নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তে চলেছে। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী নির্ঘণ্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে চলতি বছরের শেষদিকে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার ভোট হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছে। সেই লক্ষ্যেই এবার কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতির দায়িত্ব দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী **সুকান্ত মজুমদারের** হাতে তুলে দিল বিজেপি।
দলের এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট, বিধানসভা নির্বাচনের পর এবার কলকাতার পুরসভা দখলের লড়াইকেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিজেপি। শুধু প্রচার নয়, প্রার্থী বাছাই, ইস্তাহার তৈরি এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুকান্তের নেতৃত্বাধীন কমিটির হাতে থাকবে।
## কলকাতা পুরভোটের দায়িত্বে সুকান্ত মজুমদার
বিজেপির তরফে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির **ইনচার্জ** করা হয়েছে সুকান্ত মজুমদারকে। তাঁর সঙ্গে সহকারী ইনচার্জ হিসেবে থাকছেন দলের রাজ্য সহ-সভাপতি **অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়**।
অন্যদিকে মাণিকতলার বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী **তাপস রায়**কে করা হয়েছে কনভেনর। কাশীপুর-বেলগাছিয়ার বিধায়ক **ঋতেশ তিওয়ারি** থাকছেন কো-কনভেনর হিসেবে।
অর্থাৎ, কলকাতা পুরভোটের জন্য বিজেপি ইতিমধ্যেই আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করে ফেলেছে।
## পুজোর পরেই ভোটের সম্ভাবনা
কলকাতা পুরভোটের নির্দিষ্ট দিন এখনও ঘোষণা হয়নি। তবে রাজ্য সরকারের তরফে বলা হয়েছে, উৎসবের মরশুম শেষ হওয়ার পর বছরের শেষদিকে কলকাতা ও হাওড়া পুরসভার নির্বাচন হতে পারে।
ফলে দুর্গাপুজোর পর থেকেই কার্যত পুরভোটের প্রচার জমে উঠতে পারে।
কলকাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরে পুরসভা নির্বাচন বিজেপি ও তৃণমূল—দুই দলের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের প্রশাসন, নাগরিক পরিষেবা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনকে কেন্দ্র করে এই ভোটে জোরদার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
## বিজেপির বিশেষ বৈঠক
সুকান্ত মজুমদারকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে মঙ্গলবার কলকাতাকে কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করে রাজ্য বিজেপি।
বিধাননগরে দলের রাজ্য সদর দফতরে হওয়া এই বৈঠকে কলকাতা পুরসভার আওতাধীন এলাকার বিধায়ক এবং রাজ্য নেতৃত্বের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা উপস্থিত ছিলেন। বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা বাংলার সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত **সুনীল বনসল**, রাজ্যের সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক **অমিতাভ চক্রবর্তী** এবং সুকান্ত মজুমদারও বৈঠকে ছিলেন।
এই বৈঠকের পরই কলকাতা পুরভোটের জন্য নতুন দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্ত সামনে আসে।
## কেন সুকান্তের উপর এত বড় দায়িত্ব?
সুকান্ত মজুমদার এর আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির রাজ্য সভাপতি ছিলেন। ২০২১ সালে তিনি দিলীপ ঘোষের কাছ থেকে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বর্তমানে রাজ্য সভাপতির পদে না থাকলেও দলের রাজ্য সংগঠনে তাঁর ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁকে কলকাতা পুরভোটের দায়িত্ব দেওয়াকে তাই দলের কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্বের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষ করে বিধানসভা নির্বাচনের পর কলকাতার মতো শহুরে এলাকায় বিজেপির সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সুকান্তের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইছে দল।
## শুধু প্রচার নয়, প্রার্থী বাছাইও
কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতি কমিটির কাজ শুধুমাত্র প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
কমিটির সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে—
* নির্বাচনী প্রচারের পরিকল্পনা
* দলের নির্বাচনী ইস্তাহার তৈরি
* ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করা
* সম্ভাব্য প্রার্থী চিহ্নিত করা
* প্রার্থী বাছাই
* স্থানীয় সমস্যাকে নির্বাচনী প্রচারের বিষয় করা
* বুথ স্তরে সংগঠন তৈরি
অর্থাৎ, বিজেপি কলকাতা পুরভোটকে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক লড়াই হিসেবে দেখছে।
## হাওড়াতেও আলাদা কমিটি
শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া পুরসভা নির্বাচন নিয়েও বিজেপি আলাদা কমিটি তৈরি করেছে।
হাওড়ার নির্বাচনী প্রস্তুতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ **রাহুল সিনহাকে**। বালি বিধায়ক **সঞ্জয় কুমার সিং**কে করা হয়েছে কনভেনর।
এর ফলে কলকাতা ও হাওড়া—দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরসভাকেই বিজেপি একইসঙ্গে নির্বাচনী প্রস্তুতির আওতায় নিয়ে এসেছে।
## কলকাতায় ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ছে
পুরভোটের আগে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১২ আগস্ট বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা **১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার প্রস্তাব** পাস হয়েছে। একইভাবে হাওড়া পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করার প্রস্তাবও পাস হয়েছে।
এই পরিবর্তন নির্বাচনের অঙ্ককে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে—
* নতুন প্রার্থী বাছাই করতে হবে
* বুথ সংগঠন নতুন করে সাজাতে হবে
* ভোটার সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে হবে
* স্থানীয় ইস্যু চিহ্নিত করতে হবে
* পুরনো ওয়ার্ডের রাজনৈতিক হিসাব নতুন করে করতে হবে
ফলে রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এটি বাড়তি সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ।
## তৃণমূলের বিরুদ্ধে শহুরে লড়াই
কলকাতা দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। ২০২১ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। তাই বিজেপির সামনে এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল কলকাতায় নিজেদের পুরসভা-ভিত্তিক সংগঠনকে শক্তিশালী করা।
এই নির্বাচনে বিজেপি নাগরিক পরিষেবা, রাস্তা, নিকাশি, জল জমা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শহরের পরিকাঠামোর মতো বিষয়কে সামনে আনতে পারে।
অন্যদিকে তৃণমূলও নিজেদের পুর প্রশাসনের কাজ এবং শহরের উন্নয়নকে প্রচারের মূল হাতিয়ার করতে পারে।
## পুজোর পরেই রাজনৈতিক পরিবেশ গরম
দুর্গাপুজো কলকাতার রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারেও গুরুত্বপূর্ণ সময়। পুজোর পরপরই যদি পুরভোটের প্রস্তুতি দ্রুত শুরু হয়, তাহলে উৎসবের আবহ কাটতে না কাটতেই রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়ে যেতে পারে।
দলীয় সংগঠন, সম্ভাব্য প্রার্থী এবং ওয়ার্ডভিত্তিক সমীকরণ নিয়ে তখন থেকেই তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে ২০২৬ সালের শেষ কয়েক মাস কলকাতার রাজনৈতিক পরিবেশ যথেষ্ট উত্তপ্ত হতে পারে।
## কলকাতা পুরভোট বিজেপির কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিধানসভা নির্বাচনের পর কলকাতার পুরভোট বিজেপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে পারে।
পুরসভা নির্বাচন সাধারণত বিধানসভা বা লোকসভা ভোটের তুলনায় অনেক বেশি স্থানীয় ইস্যুকেন্দ্রিক। ফলে কোনও দলের সাংগঠনিক শক্তি, ওয়ার্ডভিত্তিক জনপ্রিয়তা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এখানে সরাসরি পরীক্ষা হয়।
বিজেপির জন্য তাই এই নির্বাচন শুধু কাউন্সিলর জেতার লড়াই নয়—কলকাতায় নিজেদের **শহুরে সংগঠন কতটা শক্তিশালী হয়েছে**, তারও পরীক্ষা।
## প্রার্থী বাছাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ওয়ার্ড সংখ্যা এবং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে বিজেপির কাছে প্রার্থী বাছাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে এমন প্রার্থী খোঁজা হবে, যাঁর স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এবং যিনি তৃণমূলের শক্তিশালী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন।
সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বাধীন কমিটির অন্যতম বড় দায়িত্ব হতে পারে এই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াই।
## পুরভোটের লড়াইয়ে নতুন সমীকরণ
কলকাতার পুরভোটে তৃণমূল ও বিজেপির পাশাপাশি বাম, কংগ্রেস এবং অন্যান্য দলও লড়াই করবে। ফলে বহু ওয়ার্ডে ত্রিমুখী বা বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে।
বিশেষ করে নতুন ওয়ার্ড গঠনের পর পুরনো ভোটের হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর নাও হতে পারে। কোন এলাকায় কার সংগঠন শক্তিশালী, কোন প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে—এসবই ফলাফলে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
## শেষ কথা
দুর্গাপুজোর পর কলকাতা পুরভোট হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেই বিজেপি নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে **সুকান্ত মজুমদারকে কলকাতা পুরভোটের ইনচার্জ** করা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় সহকারী ইনচার্জ, তাপস রায় কনভেনর এবং ঋতেশ তিওয়ারি কো-কনভেনর হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
একইসঙ্গে হাওড়া পুরসভার জন্যও আলাদা নির্বাচনী কমিটি তৈরি করেছে বিজেপি।
আনুষ্ঠানিক ভোটের দিন এখনও ঘোষণা হয়নি। তবে পুজোর পরেই যদি ভোট হয়, তাহলে হাতে সময় খুব বেশি নেই। তার উপর কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে ২০৯ করার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই পাস হয়েছে।
ফলে কলকাতার পুরভোট এবার শুধু তৃণমূল-বিজেপির লড়াই নয়—**নতুন ওয়ার্ড, নতুন প্রার্থী এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণেরও বড় পরীক্ষা** হতে চলেছে।


