ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও অর্থনীতিতে ফের বড়সড় চাপ তৈরি হল। তেহরানের বিরুদ্ধে এবার আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পথে হাঁটছে আমেরিকা। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে কার্যত সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখলে তাদেরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপের লক্ষ্য ইরানের আয়ের প্রায় সমস্ত সম্ভাব্য উৎস বন্ধ করে দেওয়া এবং দেশটির আর্থিক ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি শুধু আমেরিকা ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলির উপরও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি, পরিবহণ, শিপিং, প্রযুক্তি, ডিজিটাল সম্পদ, সোনা এবং বিমান পরিবহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিকে লক্ষ্য করা হতে পারে।
## ইরানের আর্থিক জীবনরেখা কাটাই লক্ষ্য
মার্কিন অর্থ দফতরের নতুন নীতির মূল লক্ষ্য হল ইরানের অর্থনীতির সেই সমস্ত উৎস বন্ধ করে দেওয়া, যেগুলির মাধ্যমে তেহরান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে আয় করছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য, শুধু ইরানের উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; তেহরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন চালিয়ে যাওয়া তৃতীয় দেশের সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে এবার নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের বার্তা কার্যত স্পষ্ট—তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে গেলে মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
## ‘Economic D-Day’-এর হুঁশিয়ারি
নতুন মার্কিন পদক্ষেপকে বেসেন্ট একটি **“economic D-Day”** হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ইরানের উপর এবার সর্বাত্মক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের আশা, ইরানের অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল করে দিলে তেহরানের উপর যুদ্ধ এবং পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়ে চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার জন্যও ইরানের উপর চাপ তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
এই কৌশলের একটি বড় অংশ হল secondary sanctions। অর্থাৎ কোনও দেশ সরাসরি আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও যদি তারা ইরানের সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যবসা চালিয়ে যায়, তাহলে সেই দেশের সংস্থা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মার্কিন ব্যবস্থার বাইরে চলে যেতে পারে।
## কোন কোন দেশ চাপে পড়তে পারে?
এই নতুন নীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল—ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কোন কোন দেশ এর প্রভাবের মুখে পড়বে?
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা বিভিন্ন দেশের উপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, তুরস্ক এবং ইরাকের মতো দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে মার্কিন প্রশাসন প্রতিটি দেশের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ না করেও একটি বৃহত্তর সতর্কবার্তা দিয়েছে। অর্থাৎ কোনও দেশ বা সংস্থা যদি ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের সম্ভাবনা থাকছে।
## চিনকে ঘিরে বাড়ছে জটিলতা
এই পরিস্থিতিতে চিনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চিন। ফলে তেহরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে গেলে বেজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
চিন ইতিমধ্যেই একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে। বেজিংয়ের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ছাড়া অন্য দেশের উপর এমন নিষেধাজ্ঞা চাপানো উচিত নয়।
ফলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সমীকরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
## ইউএই ইতিমধ্যেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছে
ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর অবস্থানও উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইউএই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ইরানের সঙ্গে ইউএইয়ের বাণিজ্যিক যোগাযোগ দীর্ঘদিনের।
তবে তেহরানের পক্ষ থেকে এই ধরনের পদক্ষেপকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, যারা নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সহযোগিতা করবে তাদের বিরুদ্ধেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
## ইরানের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ
যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপও বেড়েছে।
নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ আরও সংকুচিত হতে পারে। বিশেষ করে তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপরও পড়তে পারে।
## তেল রপ্তানিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল তেল। যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যেই তেল সরবরাহ ও পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। তার সঙ্গে নতুন করে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হলে ইরানের তেল বিক্রির পরিমাণ আরও কমতে পারে।
বিশেষ করে তেল পরিবহণে যুক্ত জাহাজ, বীমা সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ইরানের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণেই মার্কিন প্রশাসন ইরানের অর্থনৈতিক “lifeline” কেটে দেওয়ার কথা বলছে।
## হরমুজ প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইরান যুদ্ধের সঙ্গে **Strait of Hormuz** বা হরমুজ প্রণালীর বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই জলপথ আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের সময় এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন হরমুজকে স্বাভাবিক করার উপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে তেহরান এখনও জলপথটির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের দাবি করে আসছ
হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা থাকলে শুধু ইরান নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজার প্রভাবিত হতে পারে।
## বিশ্ববাজারে প্রভাব পড়ছে
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে দেখা যাচ্ছে। তেলের দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান সংঘাতের অনিশ্চয়তার কারণে বিভিন্ন দেশের বাজার এবং borrowing costs-এর উপরও প্রভাব পড়েছে।
অর্থাৎ ইরানকে কেন্দ্র করে সংঘাত এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা নয়। এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।
## সামরিক চাপ থেকে অর্থনৈতিক চাপে আমেরিকা
প্রথমদিকে ইরান সংঘাতে সামরিক পদক্ষেপই ছিল আমেরিকার প্রধান কৌশল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
মার্কিন প্রশাসনের যুক্তি হল, অর্থনৈতিকভাবে ইরানকে দুর্বল করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক সংঘাতের প্রয়োজন কমতে পারে। এই কারণেই নতুন নিষেধাজ্ঞাকে আগের তুলনায় আরও ব্যাপক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
## ‘Operation Economic Outcast’
মার্কিন অর্থ দফতরের নতুন অভিযানের নাম **“Operation Economic Outcast”** বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করা।
এই অভিযানের আওতায় ইরানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, সংস্থা এবং জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি এমন দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলিকেও সতর্ক করা হচ্ছে, যারা ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছে।
## কোন কোন খাত নজরে?
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ sector রয়েছে। এর মধ্যে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান পরিবহণ এবং shipping sector বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই ক্ষেত্রগুলিতে ইরানের সঙ্গে কাজ করা সংস্থাগুলিকে যদি মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে করে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ডলারভিত্তিক লেনদেন থেকে বাদ পড়া একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার জন্য অত্যন্ত বড় ঝুঁকি।
## ডলার ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করছে আমেরিকা
মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল আন্তর্জাতিক ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপ তৈরি করতে চাইছে।
কোনও সংস্থা যদি মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার আগে তাকে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি হিসাব করতে হবে।
ফলে সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলি স্বেচ্ছায় ইরান থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
## ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
আমেরিকার নতুন পদক্ষেপে তেহরানও নীরব থাকেনি। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সহযোগিতা করা দেশগুলিকে এর পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
এর ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ একদিকে আমেরিকা ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে, অন্যদিকে তেহরান সেই চাপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
## ভারতও নজরে?
ইরানের সঙ্গে ভারতেরও ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে মার্কিন secondary sanctions-এর বিস্তার ঘটলে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের জন্যও কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে কোনও নির্দিষ্ট ভারতীয় সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই পর্যায়ে মার্কিন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন দাবি করার মতো তথ্য এখানে নেই। বরং বিষয়টি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা—তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ।
## রাশিয়ার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের সঙ্গে রাশিয়ারও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তাই তেহরানকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টায় মস্কোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই একাধিক শক্তির অবস্থান পরস্পরের থেকে আলাদা। ফলে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।
## মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা
অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়বে, ততই ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। বিশেষ করে তেল পরিবহণ, জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইরান আগেও হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি যদি সামরিক বা কূটনৈতিক চাপও বাড়ে, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
## যুদ্ধের অবসান কি আরও দূরে?
আমেরিকার দাবি, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা খুবই অনিশ্চিত।
আগস্টের মাঝামাঝি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে তখন কোনও আলোচনা চলছিল না এবং আলোচনার পরিকল্পনাও নেই। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে।
ফলে যুদ্ধের সমাধানের বদলে আপাতত অর্থনৈতিক চাপই প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
## বিশ্বনেতাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
আমেরিকার নতুন হুঁশিয়ারির ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামনে কঠিন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত তৈরি হতে পারে।
একদিকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থনৈতিক প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা, ডলার লেনদেন এবং পশ্চিমা বাজারে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে যে দেশগুলির অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
## অর্থনৈতিক যুদ্ধের নতুন অধ্যায়
ইরান সংঘাত এখন ক্রমশ সামরিক যুদ্ধের পাশাপাশি একটি বড় অর্থনৈতিক সংঘাতে পরিণত হচ্ছে। আমেরিকা শুধু তেহরানকে লক্ষ্য করছে না, বরং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ককেও চাপে ফেলতে চাইছে।
এর ফলে আগামী দিনে নিষেধাজ্ঞা, secondary sanctions, shipping restrictions এবং financial isolation—এই শব্দগুলি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
## শেষ কথা
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকার নতুন অর্থনৈতিক অভিযান বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন অর্থসচিব স্কট বেসেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন এবার ইরানের আর্থিক আয়ের পথগুলি যতটা সম্ভব বন্ধ করতে চায়। পাশাপাশি তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও সংস্থাগুলিকেও সতর্ক করা হচ্ছে।
চিন, ইউএই, তুরস্ক এবং ইরাকের মতো দেশগুলির সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের কারণে এই নীতির প্রভাব শুধু তেহরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চিন ইতিমধ্যেই মার্কিন একতরফা নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে, আর ইরানও সহযোগী দেশগুলির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হরমুজ প্রণালী এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে ঘিরে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে তেলের সরবরাহ, পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়তে পারে। ফলে ইরানের উপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ আগামী দিনে কতটা কার্যকর হয় এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনও উত্তেজনা তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর গোটা বিশ্বের।


