যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে কলকাতার রাজনৈতিক ও শিক্ষামহল। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ বা ABVP-র সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং মিছিলকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। এর মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে ‘দেশবিরোধী’ স্লোগান এবং কার্যকলাপের অভিযোগ। এমন কোনও ঘটনা ঘটলে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
দিলীপ ঘোষের মন্তব্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি আবার দেশবিরোধী স্লোগান বা কার্যকলাপ দেখা যায়, তাহলে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর বক্তব্যের পর বিরোধী রাজনৈতিক শিবির এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে একইসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য আলাদা এবং এই ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
## জেনারেল বডি মিটিং ঘিরে শুরু উত্তেজনা
সাম্প্রতিক অশান্তির সূত্রপাত হয় বুধবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অরবিন্দ ভবনে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একটি General Body বা GB Meeting-কে কেন্দ্র করে। ওই বৈঠকে কারা অংশ নিতে পারবেন এবং এমন বৈঠকের বৈধতা নিয়েই প্রথমে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ, ABVP-র কয়েকজন সদস্য বৈঠকের মধ্যে ঢুকে প্রশ্ন তোলেন—বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্র সংসদ না থাকলে এই ধরনের GB Meeting কীভাবে হচ্ছে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে বচসা এবং হাতাহাতির অভিযোগ সামনে আসে। ABVP-র দাবি, তাদের কয়েকজন সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। অন্যদিকে, বাম ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর রাতের মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন পরিস্থিতি আরও রাজনৈতিক রূপ নেয়।
## পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস
বুধবার রাতের ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার SFI-সহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি কর্মসূচি নেয়। অন্যদিকে ABVP-ও পাল্টা কর্মসূচির ডাক দেয়। দুই পক্ষের জমায়েত এবং মিছিলকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
যাদবপুরের মতো রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় একটি ক্যাম্পাসে এই ধরনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তার মধ্যে কোনটি ঘটনার কোন পর্যায়ের, কিংবা সম্পূর্ণ ঘটনার প্রেক্ষাপট কী—তা নিয়ে নানা দাবি সামনে আসছে। ফলে যাচাই না করা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেই কারণে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
## কেন সরব হলেন দিলীপ ঘোষ?
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে মুখ খোলেন দিলীপ ঘোষ। তিনি অভিযোগ করেন, যাদবপুরে আগেও দেশবিরোধী স্লোগান বা কার্যকলাপের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বক্তব্য, ভবিষ্যতে এমন কোনও ঘটনা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না।
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ তাঁর ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ মন্তব্য। তিনি বলেন, আগে SFI-এর অফিস ভাঙা হয়েছিল এবং আবার যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিরোধী গতিবিধি বা স্লোগান দেখা যায়, তাহলে ফের কঠোর পদক্ষেপ করা হবে।
তাঁর এই মন্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ একজন মন্ত্রীর মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা কতটা উপযুক্ত, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
## দিলীপের মন্তব্যে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র রাজনীতির জন্য পরিচিত। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির শক্তিশালী উপস্থিতির কারণে ক্যাম্পাসটির একটি আলাদা রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ABVP-ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
ফলে ABVP এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘাত শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এর মধ্যে দিলীপ ঘোষের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক করে তুলেছে। যদিও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই বিষয়ে ভিন্ন সুরে জানিয়েছেন যে যাদবপুরের সাম্প্রতিক ঘটনায় বিজেপি সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি ABVP-কে বিজেপির ছাত্র সংগঠন হিসেবেও বর্ণনা করেননি।
ফলে একই রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যেও বিষয়টি নিয়ে আলাদা অবস্থান সামনে এসেছে।
## ABVP-র পাল্টা অভিযোগ
অন্যদিকে, ABVP-র পক্ষ থেকেও বাম ছাত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, GB Meeting নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গেলে তাঁদের সদস্যদের উপর হামলা করা হয়। এমনকি তাঁদের উদ্দেশে জাতিগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ABVP-র অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে তাঁদের কয়েকজন সমর্থক আহত হন। তাঁদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, বাইরে থেকে ABVP-র সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকে উত্তেজনা তৈরি করেন। পাল্টা সংঘর্ষে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়।
অর্থাৎ পুরো ঘটনায় দুই পক্ষই নিজেদের আক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরছে এবং অপর পক্ষকে প্রথম হামলার জন্য দায়ী করছে।
## ‘দেশবিরোধী’ স্লোগানের অভিযোগ কতটা সত্য?
বর্তমান বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ‘দেশবিরোধী স্লোগান’-এর অভিযোগ। দিলীপ ঘোষসহ বিজেপির নেতারা এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এই ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে স্লোগানের প্রকৃতি, ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
শুধুমাত্র রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ছাত্র বা সংগঠনকে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তই এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যদি সত্যিই কোনও বেআইনি বা দেশবিরোধী কার্যকলাপের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অভিযোগের প্রমাণ না থাকলে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়ানোও এড়ানো প্রয়োজন।
## ভাঙচুর নিয়েও ক্ষোভ
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক নিদর্শনের সঙ্গে যুক্ত একটি এমব্লেমের অংশ ভেঙে পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি শিক্ষকমহলেও ক্ষোভ তৈরি করেছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু সেই বিতর্ক যদি ভাঙচুর বা সম্পত্তি নষ্ট করার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তা শিক্ষার পরিবেশের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি রক্ষা এবং ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের অন্যতম দায়িত্ব। সেই জায়গায় কোনও ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলতে পারে।
## যাদবপুরে ছাত্র রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নয়, ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন সময় দেশের ও রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইস্যুতে যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন।
বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্র সংগঠন নিজেদের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছে। ফলে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নতুন রূপ পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরনো ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সংঘাত যুক্ত হয়েছে। ABVP-র সক্রিয়তা এবং SFI-সহ বাম সংগঠনগুলির পাল্টা অবস্থান তারই প্রতিফলন।
## অতীতেও সংঘাতের নজির
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ নতুন ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে মতবিরোধ, বচসা এবং সংঘর্ষ হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ছাত্র সংসদ, ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু—বিভিন্ন বিষয়েই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরও রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ABVP এবং বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে পাল্টাপাল্টি স্লোগানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ও ধর্মনিরপেক্ষতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং ছাত্র রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল।
ফলে বর্তমান ঘটনাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে যাদবপুরের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি বোঝা কঠিন হবে।
## রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রশ্ন
দিলীপ ঘোষের বক্তব্যের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটি হল—বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত?
একদিকে রাজনৈতিক নেতারা দাবি করতে পারেন, কোনও বেআইনি বা দেশবিরোধী কার্যকলাপ হলে তাঁরা প্রতিবাদ করবেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিষয় এবং ছাত্র সংগঠনগুলির অভ্যন্তরীণ বিরোধে অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
বিশেষ করে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো শব্দ ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের কারণও এখানেই। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে আরও সংযত ভাষা ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে দিলীপ ঘোষের সমর্থকদের বক্তব্য, তাঁর মন্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল কঠোর পদক্ষেপের বার্তা দেওয়া।
## পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
এ ধরনের সংঘর্ষের ক্ষেত্রে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষের অভিযোগের সত্যতা যাচাই, CCTV ফুটেজ পরীক্ষা এবং সংঘর্ষে কারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। একইসঙ্গে কোনও পক্ষ যাতে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিশেষ সুবিধা না পায়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তাই জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে তা স্পষ্ট করা—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
## পড়াশোনার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার রাজনৈতিক সংঘর্ষ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা। যাঁরা কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁরাও ক্যাম্পাসে উত্তেজনার কারণে সমস্যায় পড়তে পারেন।
ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা এবং প্রশাসনিক কাজ স্বাভাবিকভাবে চালানোর জন্য শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন শিক্ষাবর্ষের সময়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব পড়াশোনার উপর পড়তে পারে।
তাই ছাত্র সংগঠনগুলির রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াই থাকলেও তা যেন হিংসা বা ভাঙচুরে না পৌঁছয়, সেই বিষয়ে সব পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে।
## দিলীপের বার্তা ঘিরে নতুন বিতর্ক
দিলীপ ঘোষের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ মন্তব্যের ফলে যাদবপুরের ঘটনাটি রাজ্য রাজনীতির আরও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্যে একদিকে কঠোর প্রশাসনিক অবস্থানের বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে বিরোধীদের মতে এই ধরনের ভাষা উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে।
এরই মধ্যে বিজেপির অন্য নেতাদের বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থানও দেখা যাচ্ছে। ফলে যাদবপুর ইস্যুতে রাজনৈতিক মহলের মধ্যে কী অবস্থান তৈরি হয়, তা নজর রাখার মতো।
## সামনে কী?
এখন মূল নজর থাকবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ এবং ঘটনার তদন্তের দিকে। সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিলেন, প্রথমে কারা হামলা করেছিল, কোনও ধরনের আপত্তিকর বা বেআইনি স্লোগান দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তির ক্ষতি কীভাবে হল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত থেকেই পাওয়া যেতে পারে।
একইসঙ্গে দুই পক্ষের ছাত্র সংগঠনকে আলোচনায় বসিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা গণতান্ত্রিক পরিবেশের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য হিংসায় পরিণত হলে তা শিক্ষার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
সব মিলিয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ এখন শুধু ABVP বনাম বাম ছাত্র সংগঠনের বিবাদ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ছাত্র রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং ‘দেশবিরোধী’ কার্যকলাপের অভিযোগের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দিলীপ ঘোষের কড়া মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও বড় রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
তবে পরিস্থিতি শান্ত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে তথ্যভিত্তিক তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা। রাজনৈতিক বক্তব্য যতই তীব্র হোক, শেষ পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।


