বাংলাদেশে ফের ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ সংকট। গ্যাস ও LNG সরবরাহে ঘাটতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির সংকট এবং চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ—সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভিন্ন গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সামনে আসছে। কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প এবং কৃষিক্ষেত্রেও পড়তে শুরু করেছে। গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পূর্ণ ক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ফারাক।
## গ্যাস সংকটেই মূল সমস্যা
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসছে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সাম্প্রতিক সময়ে LNG সরবরাহে একাধিক বাধা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জানা যাচ্ছে, একটি LNG টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। পরবর্তীতে আবহাওয়াজনিত সমস্যার কারণে LNG বহনকারী জাহাজ থেকেও গ্যাস খালাসে সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ১৩ আগস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২,১০০ mmcfd-তে নেমে এসেছিল, যেখানে দৈনিক চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ mmcfd।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিতে। গ্যাসের অভাবে বহু কেন্দ্র পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমতে থাকে। একই সঙ্গে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়তে থাকে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বাড়ানো ছাড়া কার্যত অন্য কোনও তাৎক্ষণিক উপায় থাকছে না।
## গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা তুলনামূলকভাবে কম সমস্যার মুখে পড়লেও দেশের গ্রামীণ এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। বিভিন্ন পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।
কিছু এলাকায় ৮, ১০ এমনকি ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। এতে ঘরবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই ছোট ব্যবসা এবং স্থানীয় শিল্পক্ষেত্রও ক্ষতির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে যেসব ব্যবসা বিদ্যুৎনির্ভর, যেমন মুদ্রণ, ঠান্ডা সংরক্ষণ, ছোট কারখানা বা ওয়ার্কশপ—তাদের কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশের পল্লি বিদ্যুৎ সমিতিগুলি দেশের বিপুল সংখ্যক গ্রাহককে পরিষেবা দেয়। ফলে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের একটি বড় অংশের মানুষকে সরাসরি সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় বিতরণ সংস্থাগুলির কাছেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পৌঁছচ্ছে না।
## ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্প
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রও এর কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে গ্যাস সংকটের কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। CNG স্টেশনগুলিতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণে পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলিতে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কারখানার মেশিন বন্ধ হয়ে যায়, উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় উৎপাদন শুরু করতেও সময় লাগে। এর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
সিলেটের মতো অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট একসঙ্গে চা শিল্পকেও সমস্যায় ফেলেছে। অন্যদিকে, গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের বহু CNG স্টেশন পরিষেবা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
## বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দোকান বন্ধের সময় এগিয়ে আনা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল দোকান, বাজার ও শপিং মল বন্ধের সময় এগিয়ে আনা। নির্দেশ অনুযায়ী, দোকান ও বাজার রাত ৯টার পরিবর্তে রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর বিজ্ঞাপনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে হাসপাতাল, ওষুধের দোকান ও রেস্তোরাঁর মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলিকে এই বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হল সন্ধ্যার সময় যখন বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়, তখন ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে জাতীয় গ্রিডের উপর চাপ কমানো। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধুমাত্র ব্যবহার কমিয়ে স্থায়ী সমাধান করা কঠিন।
## ভারত থেকেও সাহায্য চাওয়ার উদ্যোগ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ভারত থেকেও সহায়তা চেয়েছে। অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জ্বালানির ঘাটতি সাময়িকভাবে মেটাতে এই ধরনের আমদানি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আমদানি নির্ভরতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে LNG, তেল ও অন্যান্য জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং সরবরাহজনিত সমস্যা দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ভবিষ্যতেও প্রভাবিত করতে পারে।
## Renewable Energy-র দিকে নজর
বর্তমান সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশের শক্তি ব্যবস্থায় Renewable Energy-এর গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার আরও আগে এবং দ্রুত বাড়ানো হলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারত।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে Renewable Energy-এর অংশ প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই অংশ আরও বাড়ানো গেলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ মিশ্রণে Renewable Energy-এর অংশ ২৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও রয়েছে।
বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১০,০০০ মেগাওয়াট Renewable Energy capacity তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জমি, গ্রিড সংযোগ এবং নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হবে।
## সাময়িক স্বস্তি এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গেলেও সংকট পুরোপুরি দূর হয়নি। Power Grid Bangladesh-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্টের বিভিন্ন সময়ে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি ছিল। সন্ধ্যার peak সময়েও কয়েকশ মেগাওয়াট পর্যন্ত load-shedding নথিভুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ আগের তুলনায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত হলেও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উপর চাপ এখনও রয়েছে। LNG সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া, গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তে থাকা—এই তিনটি বিষয় আগামী দিনগুলিতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট শুধুমাত্র একটি সাময়িক power shortage নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্যাস সরবরাহ, LNG আমদানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি energy planning-এর মতো একাধিক বিষয়। তাই তাৎক্ষণিকভাবে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় energy infrastructure তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


