হুগলির শ্রীরামপুরের মাহেশ রথযাত্রা শুধু বাংলার প্রাচীনতম রথ উৎসবের জন্যই নয়, এখানকার ভোগ বা প্রসাদের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতিবছর রথযাত্রার সময় হাজার হাজার ভক্ত মাহেশ জগন্নাথ মন্দিরে ভিড় জমান। রথ টানার পাশাপাশি ভক্তদের অন্যতম আকর্ষণ থাকে শ্রীজগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ বা ভোগ। বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও একইভাবে বজায় রাখা হয়েছে, যা মাহেশ রথযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মাহেশের রথযাত্রাকে পুরীর পর ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা হিসেবে ধরা হয় এবং এর ইতিহাস ৬০০ বছরেরও বেশি পুরনো।
মাহেশ জগন্নাথ মন্দিরে প্রতিদিনের নিত্যভোগের পাশাপাশি রথযাত্রা উপলক্ষে বিশেষ ভোগের আয়োজন করা হয়। এই ভোগে থাকে সুগন্ধি সাদা ভাত, ঘি, ডাল, বিভিন্ন ধরনের নিরামিষ তরকারি, শুক্তো, লাবড়া, ভাজা, চাটনি, পায়েস এবং নানা ধরনের মিষ্টান্ন। পেঁয়াজ ও রসুন ছাড়া সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক নিয়মে এই সমস্ত খাবার প্রস্তুত করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, শ্রীজগন্নাথদেবকে নিবেদন করার পর এই ভোগ মহাপ্রসাদে পরিণত হয় এবং তা গ্রহণ করা অত্যন্ত পুণ্যজনক।
রথযাত্রার বিশেষ দিনে বহু জায়গায় **ছাপ্পান্ন ভোগ (Chhappan Bhog)**-এর প্রথাও পালন করা হয়। যদিও মাহেশে প্রতিদিন ৫৬টি পদ পরিবেশন করা হয় না, তবে বিশেষ তিথি ও উৎসবে বিভিন্ন ধরনের ফল, মিষ্টি, ক্ষীর, খিচুড়ি, নানা রকম পিঠা, দই, ছানা এবং ঐতিহ্যবাহী নিরামিষ পদ দিয়ে সমৃদ্ধ বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয়। এই ভোগের মাধ্যমে ভক্তরা ভগবান জগন্নাথের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি প্রকাশ করেন। ছাপ্পান্ন ভোগের ধারণা জগন্নাথ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাহেশ রথযাত্রার সময় বিশাল মেলাও বসে। সেখানে ভোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রসাদ, খাজা, গজা, নাড়ু, মুড়কি, বাতাসা, জিলিপি, পাপড় ভাজা এবং ঐতিহ্যবাহী বাংলা মিষ্টির দোকান দেখা যায়। বহু মানুষ রথ দর্শনের পর মন্দির থেকে মহাপ্রসাদ সংগ্রহ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য বাড়িতেও নিয়ে যান। এই প্রসাদকে শুভ ও পবিত্র বলে মনে করা |
ভোগ তৈরির ক্ষেত্রে এখনও বহু প্রাচীন নিয়ম মেনে চলা হয়। নির্দিষ্ট রাঁধুনিরা শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিতে রান্না করেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ধর্মীয় আচার কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। রান্নায় ব্যবহৃত উপকরণগুলিও আগে দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদন করার উপযোগী কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। এই ঐতিহ্যই মাহেশের ভোগকে অন্য অনেক জায়গার প্রসাদ থেকে আলাদা করেছে।
শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, মাহেশের ভোগ স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রথযাত্রার সময় বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও মন্দির কমিটির উদ্যোগে হাজার হাজার ভক্তের মধ্যে বিনামূল্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অনেক পরিবার আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অন্নদান বা ভোগ বিতরণের আয়োজন করে। এর মাধ্যমে সমতা, ভ্রাতৃত্ব এবং সেবার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সমা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাহেশের ভোগের মূল আকর্ষণ শুধু তার স্বাদ নয়, বরং তার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। ভক্তদের বিশ্বাস, এই মহাপ্রসাদ গ্রহণ করলে মানসিক শান্তি, শুভ শক্তির আশীর্বাদ এবং পারিবারিক কল্যাণ লাভ হয়। তাই প্রতিবছর রথযাত্রার সময় দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ মাহেশে এসে রথ দর্শনের পাশাপাশি মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন।
সব মিলিয়ে, মাহেশ রথযাত্রার ভোগ কেবল একটি খাবার নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভক্তির এক অনন্য প্রতীক। সুস্বাদু নিরামিষ পদ, শাস্ত্রসম্মত রান্নার পদ্ধতি এবং মহাপ্রসাদের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য এই ভোগকে ভক্তদের কাছে আরও বিশেষ করে তুলেছে।


