কলকাতা পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বড়সড় প্রস্তুতি শুরু করে দিল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের শিবির। কলকাতা পুরসভার আসন্ন নির্বাচনে ডিলিমিটেশনের পর তৈরি হতে চলা ২০৯টি ওয়ার্ডেই প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই গোষ্ঠী। বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিটি ওয়ার্ডে লড়াই করার পাশাপাশি পুরভোটের সামগ্রিক রণকৌশল চূড়ান্ত করতে চলতি সপ্তাহের শেষেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। ফলে কলকাতা পুরভোটকে ঘিরে বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার বিধানসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ডিলিমিটেশনের পরে কলকাতা পুরসভায় যে ২০৯টি ওয়ার্ড থাকবে, তার প্রতিটিতেই তাঁদের প্রার্থী লড়াই করবেন। শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া-সহ অন্যান্য পুরসভাতেও প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক স্বার্থকে সামনে রেখে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য। অর্থাৎ পুরভোটে কোনও আসন ছেড়ে না দিয়ে সংগঠনকে সর্বস্তরে সক্রিয় করার লক্ষ্য নিয়েছে ঋতব্রত শিবির।
### সপ্তাহ শেষে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
পুরভোটের রণকৌশল চূড়ান্ত করার জন্য সপ্তাহের শেষে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে চলেছে ঋতব্রতর নেতৃত্বাধীন শিবির। দলের সিনিয়র নেতৃত্ব এবং পুরভোটের দায়িত্বে থাকা নেতারা ওই বৈঠকে অংশ নেবেন। প্রার্থী নির্বাচন, ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন, প্রচারের কৌশল এবং বিজেপির বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করা হবে—এই সমস্ত বিষয়েই সেখানে আলোচনা হতে পারে।
ঋতব্রত নিজেই জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোনও একজন নেতার মাধ্যমে নয়, বরং নেতৃত্বের সম্মিলিত আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া হবে। অর্থাৎ পুরভোটের মতো বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ে দলীয় সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চাইছে এই গোষ্ঠী।
ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা জেলা নেতৃত্বের কাছে সম্ভাব্য ওয়ার্ডভিত্তিক প্রার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা না হলেও সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে কোনও ফাঁক রাখতে চাইছে না ঋতব্রত শিবির।
### ডিলিমিটেশন নিয়ে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে গণশুনানি
এবারের কলকাতা পুরভোটে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন। নতুন সীমানা অনুযায়ী কলকাতা পুরসভায় ২০৯টি ওয়ার্ড তৈরি হওয়ার কথা। এই ডিলিমিটেশন নিয়ে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে গণশুনানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ঋতব্রত শিবিরের তরফে দলীয় প্রতিনিধিদের সেই গণশুনানিতে তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মানচিত্র নিয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু নির্বাচনী প্রস্তুতিই নয়, ভোটের আগে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়াতেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে এই গোষ্ঠী। দলের নেতৃত্ব ইতিমধ্যেই প্রতিনিধিদের জন্য প্রয়োজনীয় গাইডলাইন ঠিক করে দিয়েছে।
পুরসভার সর্বদলীয় বৈঠকেও ঋতব্রত শিবিরের প্রতিনিধিরা ডিলিমিটেশন নিয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন। বিধানসভার উপদলনেতা সন্দীপন সাহা সেই বৈঠকে গিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। ফলে ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক স্তরে আরও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
### নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকেও নজর
পুরভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে দলের প্রতীক এবং নির্বাচনী তহবিলের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋতব্রত শিবিরের ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, পুরভোটের আগেই দলের প্রতীক এবং তহবিল নিয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারে। সেই সিদ্ধান্ত তাঁদের পক্ষে গেলে প্রার্থীদের নির্বাচনী লড়াইয়ে সাংগঠনিক সুবিধা আরও বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট শিবির।
আসলে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ে ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের সামনে দুই পক্ষের দাবি-পালটা দাবি রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির এবং ঋতব্রত নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী দু’পক্ষই দলের সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান কমিশনের কাছে তুলে ধরেছে। ফলে দলের নাম, প্রতীক এবং সাংগঠনিক স্বীকৃতি সংক্রান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত আগামী নির্বাচনগুলির ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে পারে।
### বিজেপিও ইতিমধ্যে পুরভোটের ময়দানে
কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতিতে শুধু ঋতব্রত শিবিরই নয়, বিজেপিও ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছে। বিজেপির তরফে নির্বাচনী কমিটি গঠন করে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ২০৯টি ওয়ার্ডেই বিজেপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা করে নিজেদের লড়াইয়ের অবস্থান স্পষ্ট করল ঋতব্রতর গোষ্ঠী।
এর ফলে আসন্ন কলকাতা পুরভোটে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হতে পারে। তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তার এবং অন্যান্য বিরোধী দলের অবস্থান—সব মিলিয়ে পুরভোটে বহুমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ২০৯টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে সংগঠন, প্রার্থী নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রতীকের প্রশ্নে পরবর্তী পরিস্থিতির উপর।
### ‘আসল তৃণমূল’-এর সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা
পুরভোটের প্রস্তুতির পাশাপাশি সাংগঠনিক স্তরেও নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে ঋতব্রত শিবির। মঙ্গলবারই ঋজু দত্তকে দলের জাতীয় মুখপাত্রের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা জেলা নেতৃত্বকে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা তৈরির কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে পুরভোটকে সামনে রেখে সংগঠনের নিচুতলা পর্যন্ত সক্রিয় করার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।
শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া-সহ রাজ্যের অন্যান্য পুরসভাতেও প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঋতব্রত। ফলে এই পুরভোটকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে দেখছে তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী।
সব মিলিয়ে কলকাতা পুরসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই বঙ্গ রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে। ২০৯টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা করে ঋতব্রত শিবির কার্যত বুঝিয়ে দিল, পুরভোটে তারা কোনওভাবেই পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। এখন নজর সপ্তাহান্তের বৈঠক, প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।


