পার্টি মানেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গান, খাওয়া-দাওয়া এবং অনেকের ক্ষেত্রে মদ্যপান। কিন্তু রাতের আনন্দের পরের সকালটা অনেক সময় হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা, পেটের সমস্যা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই সমস্যাকেই সাধারণভাবে হ্যাংওভার বলা হয়।
অনেকেই মনে করেন, পার্টিতে যাওয়ার আগে পেট ভরে কিছু খেয়ে নিলে পরদিনের হ্যাংওভার এড়ানো সম্ভব। পুরোপুরি হ্যাংওভার আটকানোর কোনও নিশ্চিত খাবার নেই ঠিকই, তবে মদ্যপানের আগে সঠিক ধরনের খাবার খেলে অ্যালকোহল শরীরে শোষিত হওয়ার গতি কিছুটা ধীর হতে পারে। পাশাপাশি পেট খালি না থাকায় বমি বমি ভাব বা পেটের অস্বস্তিও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। তাই পার্টির আগে কী খাচ্ছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
### খালি পেটে মদ্যপান কেন বিপজ্জনক?
খালি পেটে মদ্যপান করলে অ্যালকোহল দ্রুত রক্তে মিশে যেতে পারে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নেশা চড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর সঙ্গে রক্তে শর্করার ওঠানামা, পেটের অস্বস্তি এবং ডিহাইড্রেশনের সমস্যাও বাড়তে পারে।
খাবারে থাকা প্রোটিন, ফ্যাট এবং জটিল কার্বোহাইড্রেট হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নেয়। ফলে অ্যালকোহল শোষণের গতি ধীর হতে পারে। যদিও এর অর্থ এই নয় যে বেশি খাবার খেলেই বেশি মদ্যপান নিরাপদ হয়ে যাবে। খাবার কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে, কিন্তু অ্যালকোহলের ক্ষতিকর প্রভাব বন্ধ করে না।
## পার্টির আগে যে খাবারগুলি খেতে পারেন
### ১. ডিম
ডিম প্রোটিনের ভালো উৎস। এতে থাকা প্রোটিন দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ফলে মদ্যপানের সময় অতিরিক্ত খিদে পাওয়া বা হঠাৎ বেশি খেয়ে ফেলার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
পার্টির আগে সেদ্ধ ডিম, অল্প তেলে তৈরি অমলেট বা ডিমের সঙ্গে গোটা শস্যের টোস্ট খাওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত তেল-মশলা দিয়ে ডিম রান্না না করাই ভালো, বিশেষ করে যাঁদের গ্যাস বা অ্যাসিডিটির সমস্যা রয়েছে।
### ২. ওটস
ওটসে রয়েছে জটিল কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার। এগুলি ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। মদ্যপানের আগে ওটস খেলে পেট খালি থাকার সম্ভাবনা কমে এবং অ্যালকোহল শোষণের গতি কিছুটা ধীর হতে পারে।
দুধ বা দই দিয়ে ওটস তৈরি করা যায়। এর সঙ্গে কলা, বাদাম বা বীজ যোগ করলে প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের পরিমাণও বাড়ে। খুব বেশি চিনি দিয়ে ওটস তৈরি না করাই ভালো।
### ৩. কলা
অ্যালকোহল শরীর থেকে জল ও কিছু ইলেকট্রোলাইট বের করে দিতে পারে। কলায় পটাশিয়াম থাকে, যা শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
পার্টির আগে একটি কলা খাওয়া যেতে পারে। চাইলে কলার সঙ্গে দই, ওটস বা সামান্য বাদাম যোগ করে আরও পুষ্টিকর স্ন্যাকস তৈরি করা যায়। তবে কলা খেলে হ্যাংওভার হবে না—এমন কোনও বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। এটি কেবল একটি পুষ্টিকর খাবার হিসেবে উপকারী হতে পারে।
### ৪. মিষ্টি আলু
মিষ্টি আলুতে রয়েছে জটিল কার্বোহাইড্রেট এবং পটাশিয়াম। জটিল কার্বোহাইড্রেট ধীরে হজম হয়, ফলে দীর্ঘক্ষণ শক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে পটাশিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যে ভূমিকা রাখে।
পার্টির আগে সেদ্ধ মিষ্টি আলু, অল্প তেলে বেক করা মিষ্টি আলু বা মিষ্টি আলুর সঙ্গে ডিম কিংবা গ্রিলড চিকেন খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত নুন ও তেলে ভাজা মিষ্টি আলু এড়ানো ভালো।
### ৫. গ্রিক দই
গ্রিক দইয়ে প্রোটিন, কিছু ফ্যাট এবং কার্বোহাইড্রেট থাকে। এই সংমিশ্রণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং অ্যালকোহল দ্রুত শোষিত হওয়ার গতি কিছুটা কমাতে পারে।
চিনি ছাড়া গ্রিক দইয়ের সঙ্গে বেরি, কলা, বাদাম বা চিয়া সিড মিশিয়ে খাওয়া যায়। যাঁদের দুধজাত খাবারে অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা রয়েছে, তাঁদের বিকল্প খাবার বেছে নেওয়া উচিত।
### ৬. বাদাম ও অ্যাভোকাডো
বাদাম, আখরোট এবং অ্যাভোকাডোয় স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রয়েছে। ফ্যাট ও প্রোটিনযুক্ত খাবার পাকস্থলী থেকে খাবার বেরোনোর গতি ধীর করতে পারে। এর ফলে অ্যালকোহল দ্রুত শরীরে শোষিত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কমে।
তবে বাদাম বা অ্যাভোকাডো বেশি খেলেই মদ্যপানের ক্ষতি বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা নয়। এগুলিকে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত নুন দেওয়া বাদাম এড়ানো উচিত।
### ৭. স্যালমন বা অন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ মাছ
স্যালমন মাছ প্রোটিন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎস। মাছ, চিকেন, ডাল বা পনিরের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার পার্টির আগে পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বাঙালিরা চাইলে অল্প তেলে রান্না করা মাছ, গ্রিলড ফিশ বা ডালের সঙ্গে ভাত খেতে পারেন। তবে অতিরিক্ত ঝাল, তেল বা ভাজাভুজি খেলে যাঁদের পেটের সমস্যা হয়, তাঁরা হালকা রান্না বেছে নিন।
### ৮. বেরি ও জলসমৃদ্ধ ফল
স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, কমলালেবু, তরমুজ বা অন্যান্য জলসমৃদ্ধ ফলে জল, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলি শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করতে পারে।
পার্টির আগে ফল খাওয়া ভালো অভ্যাস হলেও শুধু ফল খেয়ে মদ্যপান করা উচিত নয়। ফলের সঙ্গে প্রোটিন ও জটিল কার্বোহাইড্রেট যুক্ত খাবার থাকলে খাবারটি আরও সুষম হয়।
## শুধু খাবার নয়, জলও গুরুত্বপূর্ণ
অ্যালকোহল মূত্রত্যাগ বাড়িয়ে ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে। তাই পার্টির আগে, মদ্যপানের মাঝে এবং পরে পর্যাপ্ত জল খাওয়া জরুরি। একসঙ্গে অনেকটা জল না খেয়ে ধীরে ধীরে জল পান করা ভালো।
তবে জল খেলেই অ্যালকোহল দ্রুত শরীর থেকে বেরিয়ে যায় না। জল ডিহাইড্রেশনের কিছু উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু রক্তে থাকা অ্যালকোহলের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে দেয় না।
### কোন খাবারগুলি এড়াবেন?
অনেকেই মনে করেন, হ্যাংওভার আটকাতে পার্টির আগে অতিরিক্ত তেলেভাজা খাবার খাওয়া উচিত। কিন্তু পিৎজা, বার্গার, চিপস বা খুব ভারী খাবার পেটের উপর চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের অ্যাসিডিটি, গ্যাস বা বমি বমি ভাবের প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়তে পারে।
অতিরিক্ত নুনযুক্ত খাবারও তৃষ্ণা বাড়াতে পারে। আবার অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় বা এনার্জি ড্রিঙ্কও সবসময় উপকারী নয়। তাই হালকা, সুষম এবং সহজপাচ্য খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
## হ্যাংওভার হলে কী করবেন?
পরদিন হ্যাংওভার হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জল, ডাবের জল বা ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। পেট খারাপ থাকলে কলা, ভাত, টোস্ট বা আপেলসসের মতো সহজপাচ্য খাবার খাওয়া যায়।
তবে ‘আরও একটু মদ্যপান করলে হ্যাংওভার কেটে যাবে’—এই ধারণা ভুল। আরও অ্যালকোহল খেলে সমস্যা সাময়িকভাবে ঢাকা পড়তে পারে, কিন্তু শরীরের উপর চাপ বাড়ে এবং সুস্থ হতে আরও সময় লাগে। হ্যাংওভারের কোনও নিশ্চিত খাবার বা ম্যাজিক কিউর নেই; শেষ পর্যন্ত শরীরকে অ্যালকোহল বিপাক করার জন্য সময় দিতে হয়।
### শেষ কথা
পার্টির আগে খালি পেটে মদ্যপান না করে ডিম, ওটস, কলা, মিষ্টি আলু, গ্রিক দই, বাদাম, মাছ বা সুষম খাবার খাওয়া যেতে পারে। এগুলি পেট ভরা রাখতে এবং অ্যালকোহল শোষণের গতি কিছুটা ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করা জরুরি।
তবে কোনও খাবারই অতিরিক্ত মদ্যপানের ক্ষতি আটকাতে পারে না। হ্যাংওভার এড়ানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হল মদ্যপান না করা বা পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। যাঁরা মদ্যপান করেন, তাঁদের খাবার, জল, বিশ্রাম এবং নিরাপদ যাতায়াত—সবকিছুর দিকেই নজর রাখা উচিত।


