দিল্লি থেকে ঋষিকেশ আড়াই ঘণ্টায়, কর্ণপ্রয়াগ পাঁচ ঘণ্টায়
# দিল্লি থেকে ঋষিকেশ আড়াই ঘণ্টায়, কর্ণপ্রয়াগ পাঁচ ঘণ্টায়
# Delhi To Rishikesh In 2.5 Hours, Karnaprayag In Five
ভারতের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও এক বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন রেল সংযোগ চালু হলে দিল্লি থেকে ঋষিকেশ পৌঁছতে সময় লাগতে পারে মাত্র আড়াই ঘণ্টা। একইসঙ্গে ঋষিকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগ পর্যন্ত যাত্রাও অনেক দ্রুত হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দিল্লি থেকে কর্ণপ্রয়াগ পৌঁছনো সম্ভব হতে পারে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায়। এর ফলে উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি এলাকা, চারধাম যাত্রা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলির সঙ্গে দেশের রাজধানীর যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
প্রস্তাবিত মীরাট–ঋষিকেশ নমো ভারত করিডর এবং নির্মীয়মাণ ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন—এই দুই প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। দুটি প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে দিল্লি-এনসিআর থেকে উত্তরাখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ ও পর্যটনস্থলে পৌঁছনোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
## দিল্লি থেকে ঋষিকেশে আড়াই ঘণ্টার সম্ভাবনা
বর্তমানে দিল্লি থেকে ঋষিকেশ যেতে সড়কপথে বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। যানজট, রাস্তার অবস্থা এবং আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে যাত্রার সময় আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে হরিদ্বার, রুরকি এবং দেরাদুনের দিকে যাতায়াতের সময় ছুটির মরশুমে চাপ বাড়ে।
এই সমস্যা কমাতেই মীরাট থেকে হরিদ্বার হয়ে ঋষিকেশ পর্যন্ত নমো ভারত পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দিল্লি থেকে মীরাট পর্যন্ত ইতিমধ্যেই নমো ভারত পরিষেবা চালু রয়েছে। সেই সংযোগ আরও এগিয়ে নিয়ে গেলে দিল্লি থেকে ঋষিকেশের দূরত্ব সময়ের হিসাবে অনেকটাই কমে আসতে পারে।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত হিসাব অনুযায়ী, দিল্লি থেকে ঋষিকেশ পৌঁছতে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে এই সময় এখনও সম্ভাব্য হিসাব, নিশ্চিত পরিষেবা সূচি নয়। প্রকল্পের নির্মাণ, অনুমোদন, রুট চূড়ান্তকরণ এবং পরিষেবা চালুর পরই প্রকৃত যাত্রাসময় জানা যাবে।
## ঋষিকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগে নতুন রেলপথ
উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় রেল যোগাযোগ বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন। এই রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৫ থেকে ১২৭ কিলোমিটার। প্রকল্পটি তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল দিয়ে। ফলে এই রেললাইনের বড় অংশই টানেলের ভিতর দিয়ে যাবে।
প্রকল্পের প্রায় ১০৫ কিলোমিটার অংশ টানেলের মাধ্যমে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ের ভৌগোলিক গঠন, শক্ত পাথর, ভঙ্গুর শিলা এবং ধসপ্রবণ এলাকার কারণে এই প্রকল্পে নির্মাণকাজ অত্যন্ত কঠিন। তবু একের পর এক টানেল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে।
সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, প্রকল্পে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ টানেল ব্রেকথ্রু হয়েছে। মোট ৪১টি টানেল ব্রেকথ্রু সম্পন্ন হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০.৮৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এসকেপ টানেলের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এই অগ্রগতি প্রকল্পটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
## সড়কপথের তুলনায় সময় অনেক কমবে
বর্তমানে ঋষিকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগ যেতে সড়কপথে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। পাহাড়ি রাস্তা, যানজট, ধস, বৃষ্টি এবং রাস্তার মেরামতির কারণে সময় আরও বাড়ে। বর্ষাকালে এই যাত্রা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে ওঠে।
নতুন রেললাইন চালু হলে ঋষিকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগ পৌঁছতে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ, একই পথের যাত্রাসময় প্রায় অর্ধেকেরও কম হতে পারে। দিল্লি থেকে ঋষিকেশের সম্ভাব্য আড়াই ঘণ্টার যাত্রার সঙ্গে এই সময় যোগ করলে দিল্লি থেকে কর্ণপ্রয়াগ পৌঁছতে মোটামুটি পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগতে পারে।
বর্তমানে সড়কপথে দিল্লি থেকে কর্ণপ্রয়াগ যেতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে। নতুন রেল সংযোগ চালু হলে সেই সময় অনেকটাই কমবে। ফলে সাধারণ পর্যটক, তীর্থযাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য যাতায়াত সহজ হবে।
## চারধাম যাত্রায় বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
উত্তরাখণ্ডের চারধাম যাত্রায় প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী এবং যমুনোত্রীর মতো তীর্থস্থানে পৌঁছতে যাত্রীদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। পাহাড়ি সড়কপথে যাত্রার ক্ষেত্রে আবহাওয়া এবং রাস্তার পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন চালু হলে চারধাম যাত্রার একটি বড় অংশ সহজ হতে পারে। কর্ণপ্রয়াগ ভবিষ্যতে কেদারনাথ ও বদ্রীনাথের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। রেলপথে কর্ণপ্রয়াগ পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে পরবর্তী যাত্রা করা সম্ভব হবে।
এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাত্রার চাপ কিছুটা কমতে পারে। একইসঙ্গে তীর্থযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং যাত্রার পূর্বপরিকল্পনাও সহজ হবে। তবে রেললাইন সরাসরি চারধামের মূল মন্দিরগুলিতে পৌঁছে দেবে না। কর্ণপ্রয়াগের পরবর্তী অংশে যাত্রীদের সড়কপথ, বাস, গাড়ি বা অন্যান্য পরিবহণ ব্যবহার করতে হবে।
## পাঁচটি জেলার মধ্যে সংযোগ
ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন উত্তরাখণ্ডের একাধিক জেলার মধ্য দিয়ে যাবে। প্রকল্পটির রুট দেরাদুন, টেহরি গড়ওয়াল, পাউড়ি গড়ওয়াল, রুদ্রপ্রয়াগ এবং চামোলি জেলার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলবে। এই অঞ্চলের বহু জায়গা বর্তমানে পাহাড়ি সড়কের উপর নির্ভরশীল।
রেললাইন চালু হলে শুধু পর্যটন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে। কৃষিপণ্য, স্থানীয় হস্তশিল্প, প্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং অন্যান্য পণ্য দ্রুত পরিবহণের সুযোগ তৈরি হবে। পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসা, শিক্ষা এবং প্রশাসনিক পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুবিধা বাড়তে পারে।
পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেল, হোমস্টে, রেস্তোরাঁ, গাড়ি ভাড়া, গাইড পরিষেবা এবং স্থানীয় বাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। তবে অতিরিক্ত পর্যটনের ফলে পরিবেশের উপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই রেল যোগাযোগ উন্নয়নের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
## টানেল নির্মাণে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ
হিমালয়ের ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত জটিল। পাহাড়ের ভিতরে টানেল তৈরি করতে গিয়ে অনেক সময় ভঙ্গুর শিলা, জলধারা, ফাটল এবং ভূগর্ভস্থ চাপের মুখে পড়তে হয়। ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ প্রকল্পেও এমন একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর আগে প্রকল্পের একটি টানেলের ভিতরে ভূগর্ভস্থ ফাঁপা অংশ বা ক্যাভিটি তৈরি হওয়ার ঘটনা সামনে এসেছিল। যদিও সেই ঘটনায় কোনও প্রাণহানি হয়নি, তবু পাহাড়ের ভিতরে রেললাইন নির্মাণের ঝুঁকি কতটা, তা বোঝা যায়। প্রতিটি টানেল নির্মাণের আগে ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং জল নিষ্কাশনের পরিকল্পনা করতে হয়।
প্রকল্পে মূল টানেলের পাশাপাশি এসকেপ টানেলও তৈরি করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রী বা কর্মীদের নিরাপদে বের করে আনার জন্য এই ধরনের টানেল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু রেল চলাচল নয়, যাত্রী নিরাপত্তার দিক থেকেও এই প্রকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
## প্রকল্প সম্পূর্ণ হলে কী কী সুবিধা হবে
নতুন রেল সংযোগ চালু হলে উত্তরাখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
* দিল্লি থেকে ঋষিকেশের যাত্রাসময় কমবে।
* ঋষিকেশ থেকে কর্ণপ্রয়াগ যাত্রা দ্রুত হবে।
* চারধাম যাত্রায় সময় ও পরিশ্রম কমবে।
* পাহাড়ি এলাকার পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটতে পারে।
* স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
* সড়কপথের উপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমতে পারে।
* জরুরি পরিষেবা এবং পণ্য পরিবহণে সুবিধা হতে পারে।
* দুর্গম অঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
তবে প্রকল্পের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। নির্মাণের অগ্রগতি থাকলেও যাত্রী পরিষেবা শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য সময়কে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে ধরা যাবে না।
## পর্যটন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি
রেল যোগাযোগ উন্নত হলে উত্তরাখণ্ডে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হলেও পাহাড়ি পরিবেশের উপর চাপ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতিরিক্ত যানবাহন, প্লাস্টিক বর্জ্য, জলের ব্যবহার এবং নির্মাণকাজের কারণে পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন রেললাইন চালুর সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা দরকার। নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক প্রবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পাহাড়ি ঢাল সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উন্নত যোগাযোগ যেন পাহাড়ি পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে দিল্লি–ঋষিকেশ নমো ভারত সম্প্রসারণ এবং ঋষিকেশ–কর্ণপ্রয়াগ রেললাইন উত্তরাখণ্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। প্রকল্পগুলি সম্পূর্ণ হলে দিল্লি থেকে পাহাড়ি তীর্থ ও পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছনোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তবে প্রকৃত সুবিধা পেতে হলে নির্মাণকাজ, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং পরিষেবা চালুর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


