পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জীবিকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ বাজেট
২০২৬-এ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। শিল্প, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি এবারের বাজেটে পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়গুলিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী স্বপ্ন দাসগুপ্ত বাজেট পেশ করতে গিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করবে। সেই উদ্দেশ্যেই গঠন করা হবে ২০০ কোটি টাকার ‘বেঙ্গল ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্স ফান্ড’।
পরিবেশ রক্ষায় ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ ক্লাইমেট ফাইন্যান্স ফেসিলিটির জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জলবায়ু তহবিল থেকে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের ফলে রাজ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি কার্বন শোষণের ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, তার মোকাবিলায় এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে সবুজ কর্মসংস্থান ও পরিবেশবান্ধব জীবিকার সুযোগও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষায় বিশেষ নজর
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব যেসব অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে এই অঞ্চল ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সেই কারণেই সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকার পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে রাজ্য সরকার।
বাজেট অনুযায়ী, উপকূলীয় ও বদ্বীপ অঞ্চলের জীবিকা রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। রাজ্যের ১৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা বরাবর সামুদ্রিক শৈবাল বা সি-উইড চাষকে উৎসাহিত করা হবে। এই উদ্যোগ একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে, তেমনি স্থানীয় মৎস্যজীবী ও কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের পথও খুলে দেবে।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী মৎস্য সম্পদ যোজনার আওতায় আধুনিক মাছের পোনা উৎপাদন কেন্দ্র, কোল্ড চেন অবকাঠামো এবং মাছ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মৎস্য শিল্পের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রসার ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খরা প্রবণ অঞ্চলের জন্য ৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ
পশ্চিমাঞ্চলের যেসব এলাকায় প্রতিবছর খরার সমস্যা দেখা দেয়, সেসব অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে পিএম-কুসুম প্রকল্পের আওতায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ জলের ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
বিশেষভাবে সৌরশক্তি চালিত পাম্প ব্যবহারে উৎসাহ দিতে ১৫ শতাংশ রাজ্য ভর্তুকির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে কৃষকদের সেচ খরচ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে।
উত্তরবঙ্গের জলবায়ু উপযোগী কৃষির জন্য ১০০ কোটি
উত্তরবঙ্গের পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ কোটি টাকা দার্জিলিং, কালিম্পং এবং উত্তরবঙ্গের অন্যান্য সমতল অঞ্চলে বিশেষ হর্টিকালচার ও প্লিহাউস নির্মাণে ব্যয় করা হবে।
বাকি ৫০ কোটি টাকা তরাই অঞ্চলে একটি আধুনিক মশলা হাব গড়ে তুলতে ব্যবহার করা হবে। এর ফলে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং কৃষিজ পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবেশ ও উন্নয়নের সমন্বিত বার্তা
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬-এ পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। ২০০ কোটি টাকার ক্লাইমেট রেসিলিয়েন্স ফান্ড থেকে শুরু করে সুন্দরবন রক্ষা, সি-উইড চাষ, সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা, পশুপালন এবং উত্তরবঙ্গের জলবায়ু উপযোগী কৃষি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন এবং সবুজ জীবিকা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পগুলি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি রাজ্যের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।



