বলিউড অভিনেতা চন্দ্রচূড় সিংয়ের পৈতৃক সম্পত্তি ঘিরে পারিবারিক বিবাদ এবার আরও জটিল আকার নিল। উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে তাঁদের বহু পুরনো পারিবারিক সম্পত্তি এবং ঐতিহ্যবাহী হাভেলি দখল ও বিক্রির অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে। চন্দ্রচূড় সিং এবং তাঁর ভাই অভিমন্যু সিংয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পরিবারের এক মহিলা সদস্য-সহ মোট সাতজনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে জাল উইল তৈরি, সম্পত্তির নথিতে কারচুপি এবং কোটি কোটি টাকা মূল্যের জমি ও পৈতৃক বাড়ি বেআইনিভাবে দখলের মতো গুরুতর বিষয়।
জানা গিয়েছে, ২৮ আগস্ট শুক্রবার আলিগড়ের রোরাওয়ার থানায় এই এফআইআর দায়ের করা হয়। এরপর শনিবার অভিনেতা চন্দ্রচূড় সিং তাঁর ভাই অভিমন্যু সিংকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের কাছে হাজির হন। সেখানে তাঁরা তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে নিজেদের বক্তব্য রেকর্ড করেন এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিও পুলিশের হাতে তুলে দেন। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পরিবারের তরফে আগে দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া হয়েছিল। এবার সেই বিরোধ ফৌজদারি মামলার পর্যায়েও পৌঁছে গেল।
এই সম্পত্তি বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে আলিগড়ের জালালপুর এবং তার আশপাশের একাধিক এলাকায় ছড়িয়ে থাকা সিং পরিবারের জমি। এর পাশাপাশি রয়েছে ‘জালালপুর এস্টেট’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী পৈতৃক বাড়ি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বাড়িটি ১৮৭০ সালের তৈরি এবং প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের কাছে থাকা এই সম্পত্তির মালিকানা এবং দখল নিয়েই বর্তমানে বিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। পরিবারের অভিযোগ, তাঁদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সম্পত্তির একাংশের উপর অন্যরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে কিছু জমি বিক্রিও করা হয়েছে।
অভিমন্যু সিংয়ের অভিযোগ, তাঁদের দাদু হরেন্দ্র পাল সিংয়ের মৃত্যুর ঠিক আগের সময়ে একটি উইল তৈরি করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, সেই সময়ে তাঁদের দাদু গুরুতর অসুস্থ ছিলেন এবং উইল তৈরি করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর মৃত্যুর একদিন আগে তৈরি করা ওই উইলকে পরবর্তীকালে সম্পত্তির মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই নথি আসল নয় এবং জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা তৈরি করা হয়েছিল। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং ষড়যন্ত্রের মতো অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।
অভিমন্যুর আরও অভিযোগ, পরিবারের কয়েকজন সদস্যের পাশাপাশি বাইরের কিছু ব্যক্তিও এই সম্পত্তি সংক্রান্ত ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারেন। তাঁর দাবি, ওই কথিত জাল উইলের মাধ্যমে পরিবারের মূল্যবান জমিগুলির মালিকানা নির্দিষ্ট কয়েকজনের নামে স্থানান্তরের চেষ্টা করা হয়। শুধু তাই নয়, রাজস্ব নথিতেও কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন তাঁরা মুম্বইয়ে বসবাস করায় আলিগড়ের সম্পত্তিগুলির উপর নিয়মিত নজর রাখা সম্ভব হয়নি। সেই সুযোগেই সম্পত্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জমি বিক্রির মতো ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
পরিবারের এই অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চন্দ্রচূড় সিংয়ের কাকা গঙ্গা সিংয়ের মৃত্যুর ঘটনাও। জানা গিয়েছে, গঙ্গা সিং দীর্ঘদিন সুইডেনে থাকতেন। পরে তিনি আলিগড়ের জালালপুরের পৈতৃক বাড়িতে এসে থাকতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরই পৈতৃক বাড়ি, জমি এবং ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত সম্পত্তির দখল ও মালিকানা নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে বলে পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছে।
এর আগেও চন্দ্রচূড় সিংয়ের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা প্রকাশ্যে এসেছিল। অভিনেতার অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একসময় নিজের পৈতৃক বাড়িতে প্রবেশ করতে গেলে পরিবারেরই এক সদস্য তাঁকে বাধা দেন। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে তিনি বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। সেই ঘটনার পর সম্পত্তির মালিকানা এবং দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
এবারের এফআইআরে মোট সাতজনের নাম রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কয়েকজন বাইরের ব্যক্তির নামও রয়েছে। অন্যান্য প্রতিবেদনে গায়ত্রী দেবী, জয় সিং এবং অঞ্জনি সিং-সহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় জাল নথি তৈরি, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এফআইআরে নাম থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়। পুলিশ তদন্তের পরই অভিযোগগুলির সত্যতা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে।
চন্দ্রচূড় সিং জানিয়েছেন, আপাতত সাতজনের নাম দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত এগোলে আরও নাম সামনে আসতে পারে। তাঁর পরিবারের বক্তব্য, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি বাড়ি বা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ নয়; তাঁদের পূর্বপুরুষদের বহু বছরের সম্পত্তি কীভাবে সংরক্ষিত থাকবে, সেটিও এর সঙ্গে জড়িত। সেই কারণেই তাঁরা আইনি পথে এগিয়েছেন।
অন্যদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, পুরো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করার পাশাপাশি মামলার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সম্ভাব্য সাক্ষীদের বক্তব্যও নেওয়া হবে। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে।
ফলে চন্দ্রচূড় সিংয়ের পরিবারের এই পৈতৃক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদ এখন নতুন মোড় নিয়েছে। একদিকে রয়েছে প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো জালালপুর এস্টেট এবং বিস্তীর্ণ পারিবারিক জমি, অন্যদিকে রয়েছে কথিত জাল উইল, সম্পত্তি দখল এবং নথি পরিবর্তনের অভিযোগ। দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি এবার ফৌজদারি তদন্ত শুরু হওয়ায় আগামী দিনে এই মামলায় আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। এখন পুলিশের তদন্ত এবং আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার দিকেই নজর রয়েছে।


