পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে ফের চাঞ্চল্য ছড়াল অনুব্রত মণ্ডলের একাধিক বিস্ফোরক মন্তব্য। কালীঘাটের তৃণমূল শিবির ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলের অন্দরে উত্তেজনা বেড়েছে। বুধবার নতুন তৃণমূলের বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অনুব্রত মণ্ডল এমন একাধিক দাবি করেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
অনুব্রত মণ্ডল দাবি করেন, দীর্ঘদিন তিনি দলের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু কঠিন সময়ে দল তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি। তাঁর অভিযোগ, তদন্তকারী সংস্থার মামলায় তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে এবং সেই পরিস্থিতির জন্য তিনি তৃণমূলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়ী করেন। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও প্রমাণ প্রকাশ করেননি।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর কয়লা ব্যবসা সংক্রান্ত মন্তব্য ঘিরে। অনুব্রতের দাবি, কয়লা সংক্রান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন স্তরে পৌঁছে দিতে হত। তিনি বলেন, “কয়লার জন্য দিনে ৪০ লক্ষ টাকা দিতে হত।” তবে এই দাবিরও কোনও স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকেও তা স্বীকৃত নয়।
অনুব্রত আরও বলেন, তিনি ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই দীর্ঘদিন রাজনীতিতে কাজ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দলের ভিতরে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে বহু পুরনো নেতা-কর্মী উপেক্ষিত হয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তনের পর থেকেই দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।
নতুন রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে অনুব্রত জানান, তিনি এখনও নিজেকে তৃণমূলের আদর্শের মানুষ বলেই মনে করেন। তাঁর বক্তব্য, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরও নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল বলেই দাবি করছে এবং সেই কারণেই তিনি সেখানে যোগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, দলের মূল আদর্শ রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অনুব্রতের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। বিরোধীরা দাবি করেছে, এই মন্তব্য তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ অনুব্রতের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকেই তিনি এমন মন্তব্য করছেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “অভিষেক কোনও ভুল করেনি” এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের অভ্যন্তরে যে মতবিরোধ সামনে এসেছে, অনুব্রত মণ্ডলের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বিতর্ককে আরও উস্কে দিল। একসময়ের দলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত অনুব্রতের অবস্থান বদল রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে।
তবে অনুব্রতের করা আর্থিক ও সাংগঠনিক অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। রাজনৈতিক পাল্টা বক্তব্য, তদন্ত বা আদালতের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এই বিষয়গুলি আরও স্পষ্ট হতে পারে। আপাতত তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী দিনে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।


