তামিলনাড়ুর তিরুভান্নামালাইয়ের একটি সাধারণ রাস্তা দিয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল ১২ বছরের এক কিশোরী। রাস্তার পাশে এক ইস্ত্রি পেশাদারকে পোড়া কয়লা ফেলে দিতে দেখে থমকে দাঁড়ায় সে। সাধারণ মানুষ যা প্রতিদিন দেখেও এড়িয়ে যায়, সেখানে এই কিশোরী নিজেকে প্রশ্ন করে— “কেন এখনও এভাবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে? আর আমি এর জন্য কী করতে পারি?”। সেই কিশোরীই হলেন বিনিশা উমাশঙ্কর (Vinisha Umashankar)। মাত্র ১২ বছর বয়সে মাথায় আসা একটি অসাধারণ ভাবনা এবং ৬ মাসের চেষ্টায় বিনিশা তৈরি করে ফেলে সৌরচালিত ইস্ত্রি গাড়ি, যার নাম ‘আইরন ম্যাক্স’ (Iron Max)।
যেভাবে এল বিনিশা উমাশঙ্করের পরিবর্তনের ভাবনা
বাড়ি ফিরে বিনিশা প্রথমে হিসেব কষা শুরু করেন। ভারতে প্রায় ১ কোটি রাস্তার পাশের ইস্ত্রি পেশাদার রয়েছেন। প্রত্যেকে প্রতিদিন গড়ে ৫ কেজি করে কয়লা ব্যবহার করেন। এতে প্রচুর গাছ কাটা পড়ে এবং এর থেকে নির্গত ধোঁয়া ইস্ত্রিওয়ালাদের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে। এই সমস্যা মেটাতে বিনিশা কলেজ স্তরের পদার্থবিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বই পড়ে নিজেই পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে মিলে নকশা করেন ‘আইরন ম্যাক্স’।
‘আইরন ম্যাক্স’-এর সুবিধা ও বৈশিষ্ট্য:-
পরিবেশবান্ধব শক্তি: মাত্র ৫ ঘণ্টার রোদেই এই গাড়ির ইস্ত্রিটি টানা ৬ ঘণ্টা চলার মতো শক্তি সঞ্চয় করে। এতে পরিবেশের ক্ষতি না করেই কয়লার ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব।
বাড়তি উপার্জনের সুযোগ: এই ইস্ত্রি গাড়িতে ফোন চার্জিং পোর্ট যুক্ত করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা কাপড় ইস্ত্রি করার অপেক্ষায় থাকার সময় ফোন চার্জ দিয়ে বাড়তি কিছু টাকা আয় করতে পারেন।
আর্থিক উন্নতি: এর মাধ্যমে একজন ইস্ত্রির কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাসিক আয় প্রায় ১২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস: প্রতিটি গাড়ি ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ১.৮ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশ্বমঞ্চে তামিলনাড়ুর মেয়ের জয়জয়কার
বিনিশার এই উদ্ভাবন তাঁকে এনে দেয় একাধিক সম্মাননা। তিনি ভারত সরকারের ‘ড. এপিজে আবদুল কালাম ইগনাইট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ২০২০ সালে পান ‘চিলড্রেন্স ক্লাইমেট প্রাইজ’। পরবর্তীতে প্রিন্স উইলিয়ামের বিখ্যাত ‘আর্থশট প্রাইজ ২০২১’-এর সর্বকনিষ্ঠ ফাইনালিস্ট হিসেবে মনোনীত হন।
২০২১ সালের ২ নভেম্বর, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন COP26-এ ১৫ বছরের বিনিশা বিশ্বনেতাদের সামনে পাঁচ মিনিটের এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রিন্স উইলিয়ামের উপস্থিতিতে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “আমাদের ক্ষুব্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু রাগ করে বসে থাকার সময় আমার নেই, আমি কাজ করতে চাই। আমি শুধু ভারতের একটি মেয়ে নই, আমি এই পৃথিবীর এক সন্তান এবং এতে আমি গর্বিত।” তাঁর এই ভাষণ শুনে উপস্থিত বিশ্বনেতারা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান।
২০০৭ সালে জন্ম বিনিশার। তার বাবা একজন বিজনেস কনসালট্যান্ট এবং মা একজন শিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতি মেয়ের আগ্রহ দেখে মা-বাবা তাকে সবসময় নতুন বই কিনে দিয়েছেন এবং জাদুঘর, বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে গিয়েছেন। পরিবারের সেই উৎসাহই বিনিশাকে আজ এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI


