আরজি কর কাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে ফের সামনে এল সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি। ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ধরে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ, আন্দোলন এবং ন্যায়বিচারের দাবি উঠেছিল। দুই বছর পরও সেই ঘটনার স্মৃতি মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গিয়েছে। এবার সরকারি স্তরেও নির্যাতিতাকে স্মরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হল।
পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, রবিবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। সকাল **১১টা থেকে ১১টা ২ মিনিট** পর্যন্ত এই নীরবতা পালনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট ওই দুই মিনিটে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী-সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত কর্মীরা নির্যাতিতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
### দুই বছর পর সরকারি স্তরে স্মরণ
২০২৪ সালের ৯ অগস্টের ঘটনা শুধু একটি অপরাধের তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঘটনার পর কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল। চিকিৎসক, নার্স, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ রাস্তায় নেমে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন। রাত জেগে মিছিল, মোমবাতি প্রজ্বলন এবং প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্যাতিতার জন্য বিচার চাওয়া হয়েছিল।
দুই বছর পরও সেই স্মৃতি মুছে যায়নি। এবার সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে দুই মিনিট নীরবতা পালনের সিদ্ধান্ত সেই স্মৃতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলত নির্যাতিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
### বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকের পরই নির্যাতিতার স্মরণে রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে নীরবতা পালনের বিষয়টি সামনে আসে। মুখ্যমন্ত্রীও এই কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন।
শুধু সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেই নয়, পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের লোকসংস্কৃতি ভবনেও বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। নির্যাতিতার নামে গঠিত ট্রাস্টের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথাও জানানো হয়েছে।
### আরজি কর মামলায় নতুন করে তদন্তএদিকে শুধু স্মরণ কর্মসূচি নয়, আরজি কর মামলাকে ঘিরে তদন্তের ক্ষেত্রেও নতুন মোড় এসেছে। ঘটনার পর গ্রেফতার হওয়া সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে শিয়ালদহ আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছে। তবে নির্যাতিতার পরিবার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে এসেছে।
এরই মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্ত নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক নির্দেশে আদালত সিবিআইকে আগের তদন্তের ফলাফলে প্রভাবিত না হয়ে ঘটনার রাত থেকে শুরু করে তদন্তের বিভিন্ন দিক নতুন করে খতিয়ে দেখতে বলেছে। আদালতের এই নির্দেশ মামলাটিকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
আগামী **২৮ অগস্ট** তদন্তের অগ্রগতি আদালতে জানানোর কথা রয়েছে। ফলে দুই বছর পূর্তির দিনে একদিকে যখন নির্যাতিতার স্মরণে সরকারি কর্মসূচি হচ্ছে, অন্যদিকে মামলার তদন্ত নিয়েও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
### নীরবতার দুই মিনিটে কী বার্তা?
দুই মিনিটের নীরবতা সময়ের হিসেবে খুব ছোট হলেও আরজি কর কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য যথেষ্ট গভীর। এই নীরবতা শুধুমাত্র একজন নির্যাতিতাকে স্মরণ করার কর্মসূচি নয়; এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের দাবিও সামনে আসে।
আরজি কর কাণ্ডের পর চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে রাতের ডিউটিতে থাকা মহিলা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছিল। হাসপাতালের পরিকাঠামো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বিষয়টি তখন জনআলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
সেই কারণেই দুই মিনিটের নীরবতা অনেকের কাছে নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি অতীতের ভয়াবহ ঘটনাকে মনে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই প্রত্যয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
### ফের সামনে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
আরজি কর কাণ্ডের দুই বছর পরও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন পুরোপুরি পিছনে চলে যায়নি। একদিকে আদালতের রায় হয়েছে, অন্যদিকে তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন এবং পরিবারের অসন্তোষের কারণে মামলাটি ফের নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নতুন তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, আদালত সেই তথ্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং শেষ পর্যন্ত নির্যাতিতার পরিবার কতটা সন্তুষ্ট হয়—তা এখন নজরে।
এই পরিস্থিতিতে রবিবারের দুই মিনিটের নীরবতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলিতে কর্মরত মানুষ যখন নির্দিষ্ট সময়ে নীরব হয়ে দাঁড়াবেন, তখন সেই নীরবতার মধ্যেই থাকবে হারিয়ে যাওয়া এক তরুণ চিকিৎসকের স্মৃতি, তাঁর পরিবারের দীর্ঘ লড়াই এবং ন্যায়বিচারের দাবি।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আরজি করের সেই রাত বাঙালির স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। বরং নতুন তদন্ত, আদালতের নির্দেশ এবং সরকারি স্মরণ কর্মসূচির মাধ্যমে ঘটনাটি আবারও জনসমক্ষে ফিরে এসেছে। এখন সকলের নজর তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।


