কলকাতা পুলিশের পরিষেবায় শুরু হল ডিজিটাল যুগের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাধারণ মানুষের সুবিধার কথা মাথায় রেখে শহরের **সমস্ত থানায় চালু করা হয়েছে ই-জিডি (Electronic General Diary) পরিষেবা**। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে সাধারণ ডায়েরি (GD) নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে বলে আশা করছে পুলিশ প্রশাসন।
এতদিন কোনও ব্যক্তি সাধারণ ডায়েরি করতে থানায় গেলে অভিযোগ লিখে কাগজে নথিভুক্ত করা হত। নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় থানায় উপস্থিত পুলিশকর্মী সরাসরি কম্পিউটারভিত্তিক সিস্টেমে অভিযোগের সমস্ত তথ্য নথিভুক্ত করবেন। তথ্য সংরক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযোগকারীর মোবাইল নম্বরে **জিডি নম্বর-সহ একটি নিশ্চিতকরণ (Confirmation) বার্তা** পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ফলে অভিযোগ গ্রহণের প্রমাণ সঙ্গে সঙ্গেই হাতে চলে আসবে এবং ভবিষ্যতে তা সহজেই যাচাই করা যাবে।
পুলিশের মতে, এই উদ্যোগের অন্যতম বড় সুবিধা হল অভিযোগ নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমবে। আগে অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণের সময় বা নথিভুক্তির তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতো। এখন ডিজিটাল টাইমস্ট্যাম্প থাকার কারণে কখন অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তার নির্ভুল তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। বিশেষ করে নিখোঁজ ব্যক্তি, হারিয়ে যাওয়া নথি বা অন্যান্য জরুরি বিষয়ে তদন্তের ক্ষেত্রে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডিজিটাল রেকর্ডের ফলে তথ্য হারিয়ে যাওয়া বা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কাও অনেকটাই কমে যাবে। প্রতিটি জিডির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে, ফলে প্রয়োজনে দ্রুত অনুসন্ধান করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিভিন্ন তদন্ত বা প্রশাসনিক কাজে এই ডিজিটাল নথি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
তবে কলকাতা পুলিশ জানিয়েছে, আপাতত ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত কাগজে জিডি গ্রহণের ব্যবস্থাও চালু থাকবে। অর্থাৎ যাঁরা এখনও ডিজিটাল পরিষেবা ব্যবহার করতে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁরাও আগের নিয়মে অভিযোগ জানাতে পারবেন। ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করা হবে এবং ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য পুলিশ কমিশনারেট ও জেলা পুলিশ ইউনিটেও একই ধরনের পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি কলকাতা পুলিশের **‘Bondhu’ Citizen App**-এর মাধ্যমেও নাগরিকদের জন্য একাধিক ডিজিটাল পরিষেবা ইতিমধ্যেই উপলব্ধ রয়েছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া মোবাইল বা নথি সংক্রান্ত অভিযোগ, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের আবেদন, ট্রাফিক জরিমানা দেখা, এফআইআর সম্পর্কিত তথ্য, প্রবীণ নাগরিকদের ‘Pronam’ পরিষেবায় নিবন্ধনসহ বিভিন্ন পরিষেবা পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক আপডেটে ডিজিটাল জিডি-সংক্রান্ত সুবিধাও আরও উন্নত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশি পরিষেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নাগরিক পরিষেবাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে। অভিযোগ নথিভুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি তথ্য সংরক্ষণও অনেক বেশি নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীও সঙ্গে সঙ্গে একটি অফিসিয়াল রেফারেন্স নম্বর পেয়ে যাবেন, যা ভবিষ্যতে অনুসন্ধান বা তদন্তের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।
নাগরিক পরিষেবাকে আরও আধুনিক করার লক্ষ্যে কলকাতা পুলিশ গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ই-জিডি পরিষেবা চালু হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষকে আর অভিযোগ গ্রহণের প্রমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হবে না। প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত পরিষেবা দেওয়ার এই উদ্যোগকে শহরের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন প্রশাসনিক মহল।
সব মিলিয়ে, **কলকাতা পুলিশের নতুন ই-জিডি পরিষেবা সাধারণ মানুষের জন্য অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করে তুলবে।** থানায় অভিযোগ জানানো মাত্রই মোবাইলে জিডি নম্বর পৌঁছে যাবে এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত থাকবে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত আকারে চালু হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।


