পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের গতি বাড়াতে বড় উদ্যোগের আহ্বান জানালেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ **শমীক ভট্টাচার্য**। তিনি মুখ্যমন্ত্রী **শুভেন্দু অধিকারী**কে একটি চিঠি লিখে কেন্দ্রের **‘ভারত ঔদ্যোগিক বিকাশ যোজনা–রসায়ন (BHAVYA Rasayan)’** প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমবঙ্গে একটি আধুনিক কেমিক্যাল পার্ক স্থাপনের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন করেছেন। চিঠিতে তিনি বিশেষভাবে **সিঙ্গুরকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব** দিয়েছেন, যদিও প্রয়োজনে অন্য উপযুক্ত এলাকাও নির্বাচন করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন।
শমীক ভট্টাচার্য তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা **৩,০৩০ কোটি টাকার ‘ভাব্য রসায়ন’ প্রকল্প** অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের তিনটি বিশ্বমানের কেমিক্যাল পার্ক গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি নির্বাচিত প্রকল্পের জন্য কেন্দ্র সর্বোচ্চ **১,০০০ কোটি টাকা** পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেবে। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গ যদি দ্রুত প্রস্তাব জমা দেয়, তাহলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প প্রকল্প রাজ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে **সিঙ্গুর, হলদিয়া, দুর্গাপুর এবং রঘুনাথপুরের** নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য, যদি সিঙ্গুরে জমি সংক্রান্ত কোনও বিতর্কের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে রাজ্য সরকার অন্য কোনও বিতর্কহীন ও উপযুক্ত এলাকা নির্বাচন করতে পারে। তাঁর মতে, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পশ্চিমবঙ্গে একটি বড় শিল্প প্রকল্প নিয়ে আসা, যাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।
কেন্দ্রের প্রকল্প অনুযায়ী, একটি কেমিক্যাল পার্ক গড়তে প্রায় **২,০০০ একর সংলগ্ন জমি** প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারকে **৫০০ কোটি টাকা** আর্থিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে অন্তত **১,৫০০ কোটি টাকার শিল্প পরিকাঠামো** গড়ে উঠতে পারে। এছাড়া দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, একটি আধুনিক কেমিক্যাল পার্ক গড়ে উঠলে শুধু রাসায়নিক শিল্প নয়, **ফার্মাসিউটিক্যাল, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, কৃষি, নির্মাণ, লজিস্টিক এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME)**-এরও বড় উপকার হবে। পাশাপাশি আধুনিক **কমন এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (CETP)** এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে, যা পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাজ্য সরকারের প্রস্তুতি আরও জোরদার করতে শমীক ভট্টাচার্য কয়েকটি সুপারিশও করেছেন। তিনি শিল্প দপ্তর এবং **WBIDC**-কে নিয়ে একটি আন্তঃবিভাগীয় টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জমির নথিপত্র প্রস্তুত করা, রাজ্যের আর্থিক অংশ পরবর্তী বাজেটে বরাদ্দ করা এবং কেন্দ্রীয় রাসায়নিক ও সার মন্ত্রকের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রাখার কথাও উল্লেখ করেছেন।
চিঠির অনুলিপি রাজ্যের অর্থমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী এবং শিল্পসচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে। শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে এই প্রকল্প আনার ক্ষেত্রে তিনি কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করতে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে রাজ্যে শিল্পায়নের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেমিক্যাল পার্কের মতো বৃহৎ শিল্প প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবহণ ব্যবস্থা, গুদামজাতকরণ এবং সহায়ক শিল্পেরও দ্রুত বিকাশ ঘটে। তবে একই সঙ্গে পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমি নির্বাচন এবং স্থানীয় মানুষের মতামতকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে সিঙ্গুরের নাম ফের শিল্প প্রকল্পের সম্ভাব্য কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসায় রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অতীতে শিল্পায়নকে ঘিরে সিঙ্গুর জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। ফলে নতুন এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথে রাজ্য সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর শিল্পমহল ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
সব মিলিয়ে, **কেন্দ্রের ‘ভাব্য রসায়ন’ প্রকল্পের আওতায় পশ্চিমবঙ্গে কেমিক্যাল পার্ক গড়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে শমীক ভট্টাচার্য শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।** সিঙ্গুর-সহ একাধিক সম্ভাব্য স্থানের প্রস্তাব দিয়ে তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই নজর থাকবে।


