রাজ্যের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া নিয়ে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলতেই এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চিকিৎসকদের বেসরকারি প্র্যাকটিসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সরকারি হাসপাতালগুলিতে দীর্ঘ অপেক্ষা, চিকিৎসকের অভাব এবং রোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের নজরে ছিল। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে কিছু চিকিৎসক ব্যক্তিগত চেম্বারে বেশি সময় দিচ্ছেন। এর ফলে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ বাড়ছে এবং সাধারণ রোগীরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য দফতর নতুন করে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সরকারি চিকিৎসকরা বেসরকারি ক্লিনিক বা নার্সিংহোমে পরিষেবা দিতে চাইলে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় অনুমতি বা ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ (NOC) ছাড়া কোনও চিকিৎসক ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিষেবা দিতে পারবেন না বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে চিকিৎসকদের সরকারি দায়িত্বে কোনও প্রভাব পড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
স্বাস্থ্য দফতরের মতে, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করা নয়। বরং সরকারি হাসপাতালে রোগীদের জন্য নির্ধারিত সময় ও পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য। সরকার মনে করছে, সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং পরিষেবার মান উন্নত হলে সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
প্রশাসনের একাংশের মতে, সরকারি চিকিৎসকদের বেসরকারি প্র্যাকটিস পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না। তবে তা হবে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায়। চিকিৎসকদের পরিষেবার সময়, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং অনুমোদনের বিষয়গুলি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সরকারি হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবার মান অনেকটাই উন্নত হবে। বিশেষ করে জেলা হাসপাতাল এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসক সংকটের সমস্যা কমাতে এই ধরনের পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে।
অন্যদিকে চিকিৎসক সংগঠনের একাংশের দাবি, চিকিৎসকদের উপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক বিধিনিষেধ আরোপ করলে তার প্রভাব পরিষেবার উপরও পড়তে পারে। তাঁদের মতে, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো, কর্মীসংখ্যা এবং চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তবে স্বাস্থ্য দফতর স্পষ্ট করেছে যে, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ব্যাহত না হয়, সেটাই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রোগীদের স্বার্থ রক্ষা এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তুলতেই এই নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে এই নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় সংশোধনও করা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য চিকিৎসকদের জবাবদিহি যেমন জরুরি, তেমনই তাঁদের কাজের পরিবেশ এবং সুযোগ-সুবিধার উন্নতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই নতুন নীতির বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে স্বাস্থ্য মহল এবং সাধারণ মানুষের।


