ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রেল যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম **মৈত্রী এক্সপ্রেস**। দুই দেশের মানুষের যাতায়াত, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ট্রেনের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি এই ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালুর দাবিতে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের রেল মন্ত্রকের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে বলে খবর সামনে এসেছে। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই দুই বাংলার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
মৈত্রী এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেন নয়, বরং ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। কলকাতা এবং ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী এই আন্তর্জাতিক ট্রেন বহু বছর ধরে দুই দেশের হাজার হাজার যাত্রীর নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা পর্যটনের জন্য এই ট্রেন ব্যবহার করতেন অসংখ্য মানুষ।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কারণে এই পরিষেবা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে সীমান্ত পেরিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসার জন্য যাতায়াতকারী মানুষেরা পুনরায় ট্রেন চালুর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এবার সেই দাবিকেই আরও জোরালো করে ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
সূত্রের খবর, আবেদনপত্রে দুই দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগ দ্রুত স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। নিয়মিত ট্রেন চলাচল শুরু হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং পারিবারিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু হলে দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত অনেকটাই সহজ হবে। বিমান পরিষেবার তুলনায় ট্রেনে ভ্রমণের খরচ কম হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া আরামদায়ক যাত্রা এবং সরাসরি সংযোগও এই ট্রেনের অন্যতম বড় সুবিধা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই ট্রেন পরিষেবার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং পর্যটনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, নিয়মিত ট্রেন পরিষেবা চালু হলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ব্যবসায়িক কার্যকলাপ বাড়তে পারে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পর্যটন শিল্প এবং পরিবহণ-সংক্রান্ত পরিষেবাগুলিও এর ফলে উপকৃত হতে পারে। পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও আরও বৃদ্ধি পাবে।
তবে রেল পরিষেবা চালুর ক্ষেত্রে একাধিক প্রশাসনিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ও বিবেচনা করতে হবে। সীমান্ত পারাপারের নিয়ম, ভিসা ব্যবস্থা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা মেনে চলেই পরিষেবা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। আবেদনটি পর্যালোচনা করার পর সংশ্লিষ্ট দফতর, নিরাপত্তা সংস্থা এবং দুই দেশের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ফলে ট্রেন পরিষেবা কবে থেকে পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এদিকে, দুই বাংলার বহু মানুষ ইতিমধ্যেই এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিশেষ করে যাঁদের আত্মীয়-স্বজন দুই দেশে রয়েছেন বা নিয়মিত যাতায়াতের প্রয়োজন হয়, তাঁদের কাছে এই ট্রেন পরিষেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করছেন, পরিষেবা পুনরায় চালু হলে যাতায়াত আরও সহজ, সাশ্রয়ী এবং সময়োপযোগী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ শুধু পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও আরও মজবুত করে। তাই মৈত্রী এক্সপ্রেসের মতো পরিষেবার গুরুত্ব ভবিষ্যতেও অপরিসীম থাকবে।
সব মিলিয়ে, ঢাকার পক্ষ থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর আবেদন ঘিরে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষণা করা হয়নি, তবুও এই উদ্যোগ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় করার সম্ভাবনাকে সামনে এনে দিয়েছে। এখন নজর থাকবে ভারতের রেল মন্ত্রকের সিদ্ধান্তের দিকে এবং কবে নাগাদ এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক ট্রেনটি আবার যাত্রী পরিষেবা শুরু করতে পারে, সেটাই দেখার বিষয়।


