সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগী এবং তাঁদের পরিজনদের হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চিকিৎসার নাম করে দালালচক্রের সক্রিয়তা, ভুয়ো পরিচয়ে হাসপাতালের ভিতরে অবাধ যাতায়াত এবং রোগীদের বিভ্রান্ত করার মতো একাধিক অভিযোগ মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
নতুন উদ্যোগ হিসেবে সরকারি হাসপাতালগুলিতে চালু করা হচ্ছে **রঙভিত্তিক বা কালার-কোডেড আইডি ব্যাজ (Color Coded ID Badges)** ব্যবস্থা। এই নতুন পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনিক কর্মী, নিরাপত্তারক্ষী এবং অন্যান্য কর্মীদের আলাদা আলাদা রঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। ফলে কে কোন বিভাগের কর্মী, তা এক নজরেই বুঝে নেওয়া সম্ভব হবে।স্বাস্থ্য দফতরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হল হাসপাতালের ভেতরে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা, রোগীদের বিভ্রান্তি কমানো এবং চিকিৎসা পরিষেবায় আরও স্বচ্ছতা আনা।
কেন নেওয়া হল এই সিদ্ধান্ত?
গত কয়েক বছরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালচক্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে। অনেক সময় রোগীদের ভুল তথ্য দিয়ে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া, দ্রুত চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় অথবা হাসপাতালের কর্মী পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে।
এই ধরনের ঘটনায় লাগাম টানতেই স্বাস্থ্য দফতর পরিচয়পত্র ব্যবস্থাকে আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রঙভিত্তিক আইডি কার্ড চালু হলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই প্রকৃত কর্মীদের চিহ্নিত করতে পারবেন।
কীভাবে কাজ করবে নতুন ব্যবস্থা?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতালের প্রতিটি কর্মীকে নির্দিষ্ট রঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। যেমন—
* চিকিৎসকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট রঙ।
* নার্সদের জন্য আলাদা রঙ।
* স্বাস্থ্যকর্মী ও টেকনিশিয়ানদের জন্য পৃথক রঙ।
* প্রশাসনিক কর্মীদের জন্য অন্য রঙ।
* নিরাপত্তারক্ষীদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্র।
এর ফলে কোনও ব্যক্তি যদি হাসপাতালের কর্মী পরিচয় দিয়ে রোগী বা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে তাঁর পরিচয় সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।
রোগী ও পরিজনদের কী সুবিধা হবে?
এই উদ্যোগের ফলে হাসপাতালে আসা সাধারণ মানুষের একাধিক সুবিধা হবে।
* প্রকৃত হাসপাতাল কর্মীকে সহজে চেনা যাবে।
* প্রতারণার ঝুঁকি কমবে।
* দালালচক্রের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
* রোগী ও পরিবারের মধ্যে আস্থা বাড়বে।
* হাসপাতালের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে জরুরি পরিস্থিতিতেও সঠিক কর্মীকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হবেশুধু আইডি কার্ড নয়, অনেক হাসপাতালেই ইতিমধ্যে সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার কাজ চলছে। নতুন কালার-কোডেড ব্যাজ সেই ব্যবস্থাকেই আরও কার্যকর করে তুলবে।
নিরাপত্তারক্ষীরাও সহজেই বুঝতে পারবেন, হাসপাতালের ভেতরে চলাফেরা করা ব্যক্তি সত্যিই হাসপাতালের কর্মী কিনা।
হাসপাতালের স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগসরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিষেবার মান উন্নত করতে স্বাস্থ্য দফতর একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অনলাইন পরিষেবা, ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং রোগীবান্ধব পরিষেবার পাশাপাশি এবার কর্মীদের পরিচয় ব্যবস্থাতেও আধুনিকীকরণ আনা হচ্ছে।
এর ফলে হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজেও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
বিশেষজ্ঞদের মতস্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র নিরাপত্তারক্ষী বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হয় না। হাসপাতালের প্রতিটি কর্মীর পরিচয় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা গেলে প্রতারণার সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।
তবে তাঁরা এটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই উদ্যোগ সফল করতে নিয়মিত নজরদারি, পরিচয়পত্র যাচাই এবং জনসচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাস্বাস্থ্য দফতর ভবিষ্যতে স্মার্ট আইডি কার্ড, কিউআর কোডভিত্তিক পরিচয় যাচাই এবং ডিজিটাল অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থাও চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এতে হাসপাতালের নিরাপত্তা আরও উন্নত হবে এবং অননুমোদিত প্রবেশ রোধ করা সহজ হবে।
রোগী সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপরঙভিত্তিক পরিচয়পত্র চালুর এই উদ্যোগ সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগী নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমানো, প্রতারণা রোধ এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


