কলকাতা: সাফল্যের গল্প সব সময় ঝকঝকে কোচিং সেন্টার বা সুযোগ-সুবিধায় ভরা ঘর থেকে শুরু হয় না। কোনও কোনও সাফল্যের জন্ম হয় ধুলোয় ভরা গ্রামের রাস্তায়, অভাবের সংসারে আর এক মায়ের নিঃশব্দ আত্মত্যাগের মধ্যে। মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার ছোট্ট গ্রামের ছেলে কোলাপে প্রवीণ উত্তমরাওয়ের জীবন যেন তারই প্রমাণ। চারবার UPSC Prelims-এ ব্যর্থতা, ৩০টিরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় হতাশা, বাবাকে হারানো এবং চরম আর্থিক অনটন—সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত UPSC Civil Services Examination 2025-এ সর্বভারতীয় স্তরে ৫৮৪ র্যাঙ্ক অর্জন করেন তিনি।
মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার খরাপ্রবণ ছোট্ট গ্রাম মিটকির বাসিন্দা প্রवीণ। কৃষির উপর নির্ভরশীল পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা কোনও দিনই ছিল না। দ্বাদশ শ্রেণিতে তাঁর প্রাপ্ত নম্বর ছিল মাত্র ৬০ শতাংশ। ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যালের মতো পেশাদার কোর্সে পড়ার সুযোগ হয়নি। শেষ পর্যন্ত বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের একটি কলেজে BSc কোর্সে ভর্তি হন তিনি। প্রতিদিন বাসে দীর্ঘ পথ যাতায়াত করেই চলত পড়াশোনা।
প্রवीণের জীবনের মোড় ঘুরেছিল ২০১৯ সালের ৫ জুন। সেদিন ক্রিকেট বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রোহিত শর্মার ধৈর্যশীল শতরান তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেখান থেকেই UPSC পরীক্ষায় বসার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি। ভেবেছিলেন, কঠোর পরিশ্রম করলে হয়তো দ্রুতই সাফল্য আসবে। কিন্তু সেই পথ শেষ পর্যন্ত প্রায় সাত বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ে পরিণত হয়।
শুরুতেই একের পর এক ধাক্কা। পরপর চারবার UPSC Preliminary Examination-এ ব্যর্থ হন প্রवीণ। প্রতি বছর ফল প্রকাশের পর তালিকায় নিজের রোল নম্বর খুঁজতেন। কিন্তু বারবার হতাশ হতে হয়েছে। শুধু UPSC নয়, ব্যাঙ্কিং, SSC এবং রাজ্য স্তরের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা মিলিয়ে ৩০টিরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসেছিলেন তিনি। কিন্তু কোনও পরীক্ষাই তাঁর জন্য বিকল্প সাফল্যের দরজা খুলে দেয়নি।
এর মধ্যেই জীবনে নেমে আসে আরও বড় বিপর্যয়। করোনা অতিমারীর সময় কিডনির অসুখে বাবাকে হারান প্রवीণ। পরিবারের সঞ্চয় বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। দুই ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তাঁর মা আখ কাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। বছরের প্রায় ছয় মাস দূরের এলাকায় গিয়ে আখ কাটতেন। বছরের বাকি সময় অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন।
একদিকে মা রোদে পুড়ে মাঠে কাজ করছেন, অন্যদিকে ছেলে নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পুনে বা দিল্লিতে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার সামর্থ্য ছিল না প্রवीণের। তাই তিনি কারাডে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সপ্তাহান্তে বাড়ি ফিরে মাকে মাঠের কাজে সাহায্যও করতেন।
নামজাদা UPSC কোচিং ইনস্টিটিউট ছিল না, ছিল না দামি টেস্ট সিরিজের সুবিধা। ছোট্ট লাইব্রেরিতে বসেই পড়াশোনা চালাতেন প্রवीণ। নিজের ভুল নিজেই বিশ্লেষণ করতেন। উত্তর লেখার অনুশীলনের জন্য সাধারণ কাগজ ব্যবহার করতেন। একের পর এক ব্যর্থতার পরেও নিজের প্রস্তুতির পদ্ধতি বদলেছেন, কিন্তু লক্ষ্য বদলাননি।
চারবার Prelims-এ ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি UPSC-র স্বপ্ন ছাড়েননি। মোট ছয়টি প্রচেষ্টা এবং প্রায় সাত বছরের কঠিন লড়াইয়ের শেষে এল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। UPSC Civil Services Examination 2025-এ সর্বভারতীয় স্তরে ৫৮৪ র্যাঙ্ক অর্জন করেন কোলাপে প্রवीণ উত্তমরাও।
ফল প্রকাশের দিনও তাঁর মা বাড়িতে বসে অপেক্ষা করছিলেন না। তিনি তখন অন্যের জমিতে গম কাটার কাজ করছিলেন। সেখানেই মায়ের কাছে পৌঁছে ছেলে জানান বহু বছরের অপেক্ষার খবর—তিনি UPSC-তে সফল হয়েছেন।
প্রवीণের গল্প শুধু একটি কঠিন পরীক্ষা পাশ করার গল্প নয়। এটি বারবার ব্যর্থ হয়েও ফিরে আসার গল্প। এটি এমন এক মায়ের গল্প, যিনি নিজের হাতে আখ কাটলেও ছেলের হাত থেকে বই সরতে দেননি। দামি কোচিং, বড় শহর বা বিপুল অর্থ ছাড়াও যে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবারের সমর্থন একজন মানুষকে অসম্ভবের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে, প্রवीণের জীবন তারই অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
Education Loan Information:
Calculate Education Loan EMI


