উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে এক চাঞ্চল্যকর জোড়া মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি ভাড়া বাড়ি থেকে এক যুবকের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হওয়ার পাশাপাশি কিছু দূরের রেললাইন থেকে উদ্ধার হয়েছে এক মহিলার মৃতদেহ। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, মৃত দু’জন সম্পর্কে মামি ও ভাগ্নে। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি এবং মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও পুলিশ এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছয়নি এবং ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত যুবকের নাম দেবাশিস মণ্ডল (প্রায় ৩২ বছর) এবং মৃত মহিলার নাম রুনু মণ্ডল (প্রায় ৩৩ বছর)। শনিবার সকালে বসিরহাটের সাঁইপালা সংলগ্ন এলাকার একটি ভাড়া বাড়ির দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয় দেবাশিসের ঝুলন্ত দেহ। একই সময়ে বসিরহাট স্টেশন সংলগ্ন অনন্তপুর রেললাইন এলাকা থেকে উদ্ধার হয় রুনু মণ্ডলের মৃতদেহ। দুটি মৃত্যুর মধ্যে কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সম্পর্কে মামি-ভাগ্নে হলেও গত প্রায় এক বছর ধরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি দুই পরিবারের নজরে আসার পর প্রবল অশান্তির সৃষ্টি হয়। এরপর তাঁরা বাড়ি ছেড়ে বসিরহাটের ওই ভাড়া বাড়িতে একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন বলে অভিযোগ। এই সম্পর্ক নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বিরোধ চলছিল বলে জানা গিয়েছে।
মৃত যুবকের পরিবারের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরেই দেবাশিস মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ছিলেন। তিনি নাকি ফোন করে বাবাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি বাড়ি ফিরতে চান এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায় বোধ করছেন। এমনকি তাঁকে ঘরের ভিতরে আটকে রাখা হয়েছে বলেও পরিবারের সদস্যদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। এই দাবিগুলির সত্যতা অবশ্য এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক অংশটি সামনে আসে শুক্রবার রাতের একটি ফোনকলকে ঘিরে। দেবাশিসের পরিবারের দাবি, রুনু মণ্ডল নিজেই ফোন করে দেবাশিসের বাবাকে জানান যে তিনি দেবাশিসকে মেরে ফেলেছেন এবং এরপর নিজেও আত্মহত্যা করবেন। ফোনের পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে উদ্ধার হয় দুই মৃতদেহ। এই ফোনকলের সত্যতা এবং তার প্রেক্ষাপটও তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এটি শুধুমাত্র আত্মহত্যার ঘটনা নয়। তাঁদের দাবি, দেবাশিসকে প্রথমে হত্যা করা হয়েছে এবং তারপর রুনু আত্মঘাতী হয়েছেন। তবে পুলিশ এখনও এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। তদন্তকারীরা ফরেন্সিক রিপোর্ট, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখছেন।
এদিকে রুনু মণ্ডলের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। ফলে ঘটনার একাধিক দিক এখনও অস্পষ্ট রয়ে গিয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কোনও সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ওই দম্পতি সদৃশ যুগল ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছিলেন। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রতিবেশীদের খুব বেশি ধারণা ছিল না। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় জমান। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তদন্ত শুরু করে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় আত্মহত্যা, প্ররোচনা, হত্যাকাণ্ড অথবা অন্য কোনও অপরাধমূলক দিক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে বৈজ্ঞানিক তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র পারিবারিক অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই ফরেন্সিক রিপোর্ট এবং ডিজিটাল প্রমাণ এই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বর্তমানে দুই মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারী আধিকারিকরা পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন এবং মৃত্যুর আগে দু’জনের গতিবিধি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই জোড়া মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।


