বর্তমানে ভারতে ই-রিকশা বা টোটো শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গাতেই অত্যন্ত জনপ্রিয় পরিবহণের মাধ্যম। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ এই যানবাহনের উপর নির্ভর করেন। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা সাধারণ মানুষ থেকে প্রশাসন—সকলকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি চিনা মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে দূর থেকেই কিছু ই-রিকশা বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই দ্রুত নড়েচড়ে বসেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ইতিমধ্যেই গুগল প্লে স্টোর এবং অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিও ঘিরে বাড়ল উদ্বেগ
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। সেই ভিডিওগুলিতে দেখা যায়, মোবাইল ফোনে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে চলন্ত ই-রিকশার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটি থেমে যাচ্ছে। ভিডিওগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে সর্বত্র যাচাই করা না হলেও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কারণ, যদি কোনও চলন্ত যানবাহন দূর থেকে বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে তা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
কোন অ্যাপ নিয়ে বিতর্ক?
সরকারি সূত্রের দাবি, **BAT-BMS** নামে পরিচিত একটি ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (Battery Management System) সম্পর্কিত অ্যাপের অপব্যবহার করা হচ্ছিল। শুধু এই একটি নয়, **Lossigy** এবং **Epoch-i-ion**-সহ আরও কয়েকটি অ্যাপ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, এই অ্যাপগুলির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে দূর থেকেই সেগুলিকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হচ্ছিল। যদিও বিষয়টি নিয়ে প্রযুক্তিগত তদন্ত এখনও চলছে, তবুও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে আগাম পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র।
কী জানাল কেন্দ্র সরকার?
ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের সচিব এস. কৃষ্ণন জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে আসার পরই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুগল ও অ্যাপলকে অ্যাপগুলি দ্রুত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ যাতে অ্যাপ স্টোরে স্থান না পায়, সে বিষয়েও আরও কঠোর নজরদারির কথা বলা হয়েছে। সরকারের স্পষ্ট বক্তব্য, জননিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা হবে না এবং যে কোনও ক্ষতিকর ডিজিটাল পরিষেবার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন এত বড় উদ্বেগ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বৈদ্যুতিক যানবাহনে বিভিন্ন স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ব্যাটারি, মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের জন্য সফটওয়্যারভিত্তিক সিস্টেম ব্যবহৃত হয়। যদি সেই সফটওয়্যার বা অ্যাপের নিরাপত্তায় ফাঁক থাকে, তাহলে অসাধু ব্যক্তিরা সেটির অপব্যবহার করতে পারেন। এর ফলে শুধু গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়াই নয়, দুর্ঘটনা, যানজট কিংবা প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে নয়, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও দেখা |
স্টোরগুলির উপরও বাড়ছে দায়িত্ব
এই ঘটনার পর গুগল ও অ্যাপলের মতো অ্যাপ স্টোর পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কেন্দ্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে কোনও অ্যাপ প্রকাশের আগে তার নিরাপত্তা, অনুমতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি আরও কঠোরভাবে পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে যেসব অ্যাপ কোনও যানবাহন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, সেগুলির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কী পরামর্শ?
সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র বিশ্বস্ত উৎস থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা উচিত। কোনও অজানা বা সন্দেহজনক অ্যাপ ইনস্টল করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি ই-রিকশা মালিকদেরও নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট করা, শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করা এবং অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি অনেকটাই কমবে।
প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তাও জরুরি
প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বৈদ্যুতিক যানবাহন আরও আধুনিক এবং ব্যবহারবান্ধব হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ধরনের সাইবার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে স্মার্ট যানবাহনের নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তদন্ত এখনও চলছে এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার।


