দীর্ঘদিন ধরেই ১৮ মাসের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) এবং মহার্ঘ ত্রাণ (DR) পাওয়ার দাবিতে সরব কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা। অষ্টম বেতন কমিশন (8th Pay Commission) ঘোষণার পর অনেকেরই আশা ছিল, বহুদিনের এই অমীমাংসিত বিষয়ের কোনও ইতিবাচক সমাধান মিলতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রের অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট হওয়ায় সেই আশায় কার্যত জল পড়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অষ্টম বেতন কমিশনের একটি বৈঠকে বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন কোভিড-১৯ অতিমারীর সময় স্থগিত থাকা ১৮ মাসের ডিএ ও ডিআর-এর বকেয়া পরিশোধের দাবি তোলে। তবে কেন্দ্র জানিয়ে দিয়েছে, এই বকেয়া অর্থ প্রদানের বিষয়ে বর্তমানে কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
কেন আটকে ছিল ১৮ মাসের DA?
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় দেশজুড়ে আর্থিক চাপ সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক ব্যয়সংকোচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই সময় ১ জানুয়ারি ২০২০, ১ জুলাই ২০২০ এবং ১ জানুয়ারি ২০২১-এ প্রাপ্য তিনটি ডিএ/ডিআর কিস্তি স্থগিত রাখা হয়। অর্থাৎ মোট ১৮ মাসের মহার্ঘ ভাতা কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের দেওয়া হয়নি।সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে সেই সময় জানানো হয়েছিল, দেশের অর্থনীতির উপর অতিমারীর প্রভাব এবং বিপুল সরকারি ব্যয়ের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরে ডিএ পুনরায় চালু হলেও, স্থগিত থাকা ওই ১৮ মাসের বকেয়া আর কখনও কর্মচারীদের হাতে পৌঁছায়নি।
অষ্টম বেতন কমিশনে ফের উঠল পুরনো দাবি
নতুন পে কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন আশা করেছিল, অতীতের এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে কর্মচারী সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা ১৮ মাসের বকেয়া ডিএ-ডিআর প্রদানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের সামনে তুলে ধরেন।তাদের বক্তব্য, অতিমারীর সময় কর্মচারীরাও দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে দীর্ঘদিনের এই বকেয়া মিটিয়ে দেওয়া সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
কেন্দ্রের অবস্থান কী?
সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, কোভিডকালে স্থগিত থাকা ডিএ ও ডিআর-এর বকেয়া দেওয়ার কোনও পরিকল্পনা বর্তমানে নেই। সংসদে পূর্বেও একই অবস্থান জানানো হয়েছিল। সরকারের মতে, ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ এককালীন প্রদান করলে সরকারি কোষাগারের উপর বড়সড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতের বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ, আপাতত ১৮ মাসের বকেয়া ডিএ-ডিআর প্রদানের বিষয়ে কেন্দ্রের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আসেনি।
কর্মচারীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ
বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই বকেয়া আদায়ের জন্য তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। একাধিকবার স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে, সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং বিষয়টি বিভিন্ন স্তরে তোলা হয়েছে। তবুও এখনও পর্যন্ত কোনও ইতিবাচক ঘোষণা না আসায় কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।অনেক সংগঠনের মতে, যখন নিয়মিত ডিএ বৃদ্ধি দেওয়া হচ্ছে, তখন অতীতের স্থগিত থাকা প্রাপ্য অর্থও পরিশোধ করা উচিত।
পেনশনভোগীদেরও একই দাবি
শুধু কর্মরত কর্মচারীরাই নন, কেন্দ্রীয় পেনশনভোগীরাও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া ডিআর প্রদানের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে মহার্ঘ ত্রাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অতিমারীর সময় আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়া তাঁদের ন্যায্য অধিকার।
অষ্টম বেতন কমিশনের দিকে নজর
অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো, ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর, ভাতা বৃদ্ধি-সহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মচারীদের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ১৮ মাসের বকেয়া ডিএ-ডিআর নিয়ে আপাতত আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে আর্থিক পরিস্থিতি অনুকূল হলে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তবে বর্তমানে এমন কোনও সরকারি ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, করোনা পরবর্তী সময়ে সরকারের ব্যয় অনেকটাই বেড়েছে। পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা এবং সামাজিক প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় অতিরিক্ত আর্থিক দায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। সেই কারণেই বকেয়া ডিএ-ডিআর প্রদানের বিষয়ে কেন্দ্র এখনও ইতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
উপসংহার
১৮ মাসের বকেয়া ডিএ-ডিআর নিয়ে বহুদিন ধরে আশা-নিরাশার দোলাচলে রয়েছেন লক্ষ লক্ষ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী এবং পেনশনভোগী। অষ্টম বেতন কমিশনের বৈঠকে বিষয়টি পুনরায় উত্থাপিত হলেও কেন্দ্রের অবস্থানে আপাতত কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফলে বকেয়া অর্থ পাওয়ার দাবিতে আন্দোলন এবং আলোচনার পর্ব আগামী দিনেও চলতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


