রাজ্যের সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য এল বড় সুখবর। দীর্ঘ প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে ফের চালু হল **উৎসশ্রী (Utsashree) পোর্টাল**। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল শিক্ষা দফতরের এই সিদ্ধান্তে বহুদিন ধরে বদলির অপেক্ষায় থাকা শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা নতুন করে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন।
শিক্ষা দফতরের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে আবারও অনলাইনে বদলির আবেদন করা যাবে। সাধারণ বদলি, পারস্পরিক বদলি (Mutual Transfer) এবং বিশেষ কারণে বদলি—সমস্ত ধরনের আবেদন আগের নিয়ম মেনেই গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এই পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ায় শিক্ষক মহলে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কেন বন্ধ ছিল উৎসশ্রী পোর্টাল?
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশেষ প্রশাসনিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে রাজ্য সরকার উৎসশ্রী পোর্টালের মাধ্যমে বদলির আবেদন গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। পরে একাধিকবার সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। শিক্ষা দফতরের দাবি ছিল, শিক্ষক নিয়োগ এবং গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বদলি প্রক্রিয়া চালু করা সম্ভব নয়।
সম্প্রতি সেই নিয়োগ সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রশাসনিক কাজ সম্পূর্ণ হওয়ায় সরকার পুনরায় বদলি প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে প্রায় চার বছর পর আবার সক্রিয় হল উৎসশ্রী পোর্টাল।
কারা আবেদন করতে পারবেন?
শিক্ষা দফতরের বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলেই শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা বদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন।যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে—
* বর্তমান বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট সময় চাকরি সম্পূর্ণ করা।
* নির্ধারিত বয়সসীমার মধ্যে থাকা।
* বদলির জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া।
* শাস্তিমূলক বা বিচারাধীন কোনও মামলায় জড়িত না থাকা।
এছাড়া বিশেষ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থলের দূরত্ব বা অন্যান্য মানবিক কারণও বিবেচনা করা হতে পারে।
কীভাবে আবেদন করবেন?
শিক্ষকদের অনলাইনে **Banglar Shiksha-এর উৎসশ্রী পোর্টালে** গিয়ে আবেদন করতে হবে। সেখানে নিজের শিক্ষক আইডি, প্যান নম্বর, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে লগ-ইন করতে হবে। এরপর নির্ধারিত বিভাগ অনুযায়ী বদলির আবেদন জমা দেওয়া যাবে।
আবেদন করার সময় প্রয়োজনীয় নথির স্ক্যান কপি আপলোড করাও বাধ্যতামূলক। আবেদন জমা দেওয়ার পর তার স্ট্যাটাসও অনলাইনে দেখা যাবে।
শিক্ষক সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়াউৎসশ্রী পোর্টাল পুনরায় চালু হওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র নতুন আবেদন গ্রহণ করলেই হবে না, ২০২১ সাল থেকে জমে থাকা পুরনো আবেদনগুলির দ্রুত নিষ্পত্তিও করতে হবে।
অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি থেকে বহু দূরের স্কুলে কর্মরত। ফলে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তাঁদের বদলির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। তাই পুরনো আবেদনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি উঠেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসশ্রী পোর্টাল চালু হওয়ার ফলে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আরও বাড়বে। আগে বহু ক্ষেত্রে কাগজপত্র জমা দেওয়া, অফিসে বারবার যাওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ ছিল। অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন, যাচাই এবং অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে শহর ও গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষকদের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন নিশ্চিত করতেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে অনেক গ্রামীণ স্কুলে শিক্ষক সংকট থাকলেও শহরের কিছু বিদ্যালয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষক রয়েছেন। বদলি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হলে এই অসামঞ্জস্য অনেকটাই কমতে পারে।
শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
যাঁরা বদলির আবেদন করতে চান, তাঁদের আবেদন করার আগে সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা উচিত। আবেদনপত্রে কোনও ভুল তথ্য দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষা দফতরের নির্ধারিত যোগ্যতার শর্তগুলি ভালোভাবে পড়ে তবেই আবেদন করা বাঞ্ছনীয়।
স্বস্তি ফিরল শিক্ষক মহলে
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর উৎসশ্রী পোর্টাল পুনরায় চালু হওয়ায় রাজ্যের হাজার হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। এখন সকলের নজর থাকবে কত দ্রুত আবেদনগুলি নিষ্পত্তি হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বদলির আবেদনগুলির সমাধান কবে হয়। শিক্ষা দফতরের এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।


