তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনার জেরে বড়সড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। বুধবার দুপুরে কলকাতার তারাতলা এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর কলকাতা পুরসভার অধীনস্থ সমস্ত নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্নে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি ঘোষণা করেন, আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতা শহরের অধিকাংশ নির্মাণ প্রকল্পে কাজ স্থগিত থাকবে। তবে হাসপাতাল, জরুরি জনপরিষেবা এবং বিশেষ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলিকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
বুধবার দুপুরে তারাতলার একটি নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ আচমকাই ভেঙে পড়ে। ঘটনার সময় সেখানে বহু শ্রমিক ও কর্মী কাজ করছিলেন বলে জানা যায়। ছাদ ধসের সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকল, পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা। পরবর্তীতে উদ্ধারকাজে সেনাবাহিনীকেও যুক্ত করা হয়। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অভিযান চালানো হয়।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত এই দুর্ঘটনায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একাধিক আহত ব্যক্তিকে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। প্রশাসনের অনুমান, এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে কয়েকজন জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন। সেই কারণেই উদ্ধারকার্য অব্যাহত রাখা হয়েছে। আটকে থাকা ব্যক্তিদের কাছে জল ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুর্ঘটনার পর বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তিনি পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। এরপর নবান্নে ফিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান, এই ঘটনার পর রাজ্যের নির্মাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে সরকার। সেই কারণেই কলকাতা পুরসভার আওতাধীন সমস্ত নির্মাণ প্রকল্পের নিরাপত্তা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে অনুমোদন পাওয়া বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পের নকশা, প্রযুক্তিগত অনুমোদন এবং নির্মাণ পদ্ধতি পুনরায় পরীক্ষা করা হবে।
এ জন্য একটি বিশেষ অডিট কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এই কমিটিতে পূর্ত দফতর, কলকাতা পুরসভা, সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ, দমকল বিভাগ এবং কেএমডিএ-র প্রতিনিধিরা থাকবেন। পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে থাকবেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। প্রয়োজন অনুযায়ী কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা হবে।
সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে শহরের বিভিন্ন নির্মীয়মাণ ভবন, বাণিজ্যিক প্রকল্প এবং বৃহৎ অবকাঠামোগত কাজগুলির নিরাপত্তা সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা হবে। কোথাও কোনও ত্রুটি, নিয়মভঙ্গ বা নিরাপত্তাহীনতা ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, প্রাথমিক তদন্তে কলকাতা পুরসভার ইঞ্জিনিয়াররা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারাতলার প্রকল্পটিতে নকশাগত বা প্রযুক্তিগত ত্রুটি থাকতে পারে। যদিও চূড়ান্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসা সংক্রান্ত সরকারি সহায়তার বিষয়েও শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তারাতলার এই দুর্ঘটনা শুধু কলকাতা নয়, গোটা রাজ্যের নির্মাণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে আগামী দিনে শুধু কলকাতা নয়, হাওড়া ও বিধাননগর সহ অন্যান্য নগরাঞ্চলেও একই ধরনের নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার। প্রশাসনের আশা, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং নির্মাণ শিল্পে নিরাপত্তা মান আরও কঠোরভাবে কার্যকর হবে।


