জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের এক অত্যন্ত কঠিন অধ্যায়ের কথা স্মরণ করলেন। আইআইটি রুরকির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নিজের কর্মজীবনের শুরুর দিকের একটি সিকিম মিশনের ঘটনা তুলে ধরেন তিনি। সেই সময় তিনি ছিলেন মাত্র কুড়ি বছরের তরুণ আইপিএস অফিসার এবং গোয়েন্দা বিভাগে কাজ শুরু করেছিলেন। একটি সীমান্ত মিশনে পাঠানো গোয়েন্দা দলের সদস্যরা নির্ধারিত সময়ে ফিরে না আসায় পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠে। পরে জানা যায়, ওই দলের সদস্যদের চিনা বাহিনী আটক করেছে। ঘটনাটির পর তদন্ত শুরু হলে ডোভালের মনে হয়েছিল, তাঁর গোটা কেরিয়ারই হয়তো শেষ হয়ে গেল।
ডোভাল জানান, সেই সময় সিকিম ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তরুণ গোয়েন্দা আধিকারিক হিসেবে তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি চালানো এবং চিনের People’s Liberation Army বা PLA-এর গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা। সেই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই একটি গোয়েন্দা দলকে সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠানো হয়েছিল।
### নির্ধারিত সময় পেরিয়েও ফেরেনি গোয়েন্দা দল
ডোভালের বক্তব্য অনুযায়ী, যে দলটিকে সীমান্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছিল, তাদের কয়েক দিনের মধ্যেই ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দলের কোনও সদস্য ফিরে আসেননি। প্রথমে কয়েক দিন অপেক্ষা করা হয়। পরে সময় আরও বাড়তে থাকে। প্রায় ১০ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনও খবর না মেলায় উদ্বেগ বাড়তে থাকে। একসময় প্রায় ১৫ দিন কেটে যায়, কিন্তু দলের সদস্যদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতি ডোভালের কাছে শুধু পেশাগত দুশ্চিন্তার কারণ ছিল না, মানবিক দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল। তিনি জানতেন না দলের সদস্যরা আদৌ জীবিত রয়েছেন কি না। সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাঁদের কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, তাও জানা সম্ভব হচ্ছিল না। এমনকী তুষারধসের মতো কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে তাঁরা পড়েছেন কি না, সেই আশঙ্কাও ছিল।
ঠিক সেই সময় সদর দপ্তর থেকে ডোভালের কাছে ফোন আসে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কি সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি দল পাঠিয়েছিলেন। ডোভাল বিষয়টি স্বীকার করার পর তাঁকে জানানো হয়, ওই দলের সদস্যদের চিনা বাহিনী আটক করেছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল।
### চিনা হেফাজত থেকে ফিরেছিলেন দলের সদস্যরা
ডোভাল জানান, পরবর্তী সময়ে আলোচনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ওই গোয়েন্দা দলের সদস্যদের ভারতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। চিনা হেফাজতে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁদের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কীভাবে একটি গোয়েন্দা দল এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ল এবং তাঁদের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্তে কোনও ভুল ছিল কি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়। আর সেই সময়ই তরুণ ডোভালের মনে হয়, তাঁর কর্মজীবনের শুরুতেই হয়তো বড় ধাক্কা এসেছে।
তিনি জানিয়েছেন, তখন তাঁর মনে হয়েছিল, **তাঁর কেরিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছে।** বয়স তখন মাত্র কুড়ি। গোয়েন্দা বিভাগের চাকরি চলে গেলে এরপর কী করবেন, সেই নিয়েও ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁর নিজের ভাষায়, সেই পদক্ষেপকে তিনি অত্যন্ত অপেশাদার বলে মনে করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তদন্তে তাঁকে এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়নি।
### ভুল ছিল সদর দপ্তরের মানচিত্র ও নকশায়
তদন্তের পরে ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে আসে। ডোভালের বক্তব্য অনুযায়ী, সদর দপ্তর থেকে গোয়েন্দা দলকে যে স্কেচ ও মানচিত্র দেওয়া হয়েছিল, তাতে কিছু ভুল এবং ত্রুটি ছিল। সেই ভুলের কারণেই গোটা মিশনটি জটিল হয়ে পড়ে। ফলে যে আশঙ্কা নিয়ে ডোভাল নিজের কেরিয়ার নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে ডোভাল শুধু নিজের অতীতের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেননি, বরং তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথাও বলেন। জীবনের কোনও একটি কঠিন পরিস্থিতিকে সবসময় শেষ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়—তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাই তার উদাহরণ। যে ঘটনাকে তিনি একসময় নিজের কেরিয়ারের শেষ বলে মনে করেছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটায়নি।
### এক শেরপার পরামর্শের কথাও স্মরণ ডোভালের
সেই কঠিন সময়ের আর একটি অভিজ্ঞতার কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তুষারাবৃত পাহাড়ে বহু বছর ধরে কাজ করা এক প্রবীণ শেরপার সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ওই ব্যক্তি তাঁকে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছিলেন।
ডোভালের বর্ণনা অনুযায়ী, যে কোনও কঠিন পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন—আপনি এখন কোথায় রয়েছেন, আপনি কোথায় যেতে চান এবং সেখানে পৌঁছনোর রাস্তা কী। প্রয়োজনে সেই পথ থেকে কীভাবে নিরাপদে ফিরে আসা যায়, সেটিও জানা দরকার। এই পরামর্শ ডোভালের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে তিনি জানান।
### তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তির গুরুত্বের বার্তা
সিকিমের পুরনো মিশনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আইআইটি রুরকির পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা বলেন ডোভাল। তিনি বর্তমান প্রজন্মকে অত্যন্ত সুযোগসমৃদ্ধ প্রজন্ম হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়নে প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি উঠে আসে।
তিনি পড়ুয়াদের বোঝাতে চেয়েছেন, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি শুধু কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই নয়, একটি দেশ ও সমাজের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই নতুন প্রজন্মের সামনে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানোর প্রয়োজন রয়েছে।
আইআইটি রুরকির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ডোভাল নিজের জীবনের এই ঘটনা তুলে ধরার মাধ্যমে কার্যত দেখান, কর্মজীবনের শুরুতে বড়সড় কোনও ব্যর্থতা বা সংকট এলেই সেটিকে শেষ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তাঁর ক্ষেত্রে একটি গোয়েন্দা মিশনের জটিলতা এবং তদন্তের আশঙ্কা একসময় কেরিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় তৈরি করেছিল। কিন্তু তদন্তে তাঁকে দায়ী করা হয়নি এবং পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পৌঁছন।
সিকিমের সেই ঘটনা তাই ডোভালের বক্তব্যে শুধুমাত্র একটি পুরনো গোয়েন্দা অভিযানের স্মৃতি নয়; বরং কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব, ভুল থেকে শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হিসেবেও উঠে এসেছে।



