বাব এল মন্দেব প্রণালীকে ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথে বাধা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ও দেশের বাজারে পেট্রল-ডিজেলের প্রাপ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সেই আবহে ভারত জানিয়েছে, পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
## বাব এল মন্দেব প্রণালী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাব এল মন্দেব হল লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। এই পথ দিয়েই ভারত মহাসাগর থেকে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল এবং ইউরোপের দিকে জাহাজ চলাচল করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহণের ক্ষেত্রে এই প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে এশিয়া ও ইউরোপের দিকে অপরিশোধিত তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহণে এই রুট ব্যবহৃত হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলিই নয়, বিশ্ববাজারেও তার প্রভাব পড়ে। জাহাজগুলিকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে পাঠাতে হলে পরিবহণের সময় এবং খরচ দু’টোই বেড়ে যায়। তার সঙ্গে যোগ হয় অতিরিক্ত বিমা খরচ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যয়।
## হুথি হামলা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুথি বাহিনী এবং সৌদি আরবের মধ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় হুথিদের অগ্রগতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ও বন্দরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার খবর সামনে এসেছে। এর ফলে বাব এল মন্দেব দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলির নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ভারত এই ধরনের হামলার নিন্দা করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, বেসামরিক ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামোয় হামলা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলপথে অবাধ ও নিরাপদ নৌচলাচল বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছে ভারত। বাব এল মন্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভারতের তরফে জানানো হয়েছে।
## ভারতের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কী জানাল নয়াদিল্লি?
বাব এল মন্দেব সংকটের জেরে ভারতে জ্বালানি সরবরাহে বড়সড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে—এমন কোনও নিশ্চিত সরকারি ঘোষণা এখনও সামনে আসেনি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং পরিবহণ খরচ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। ফলে পশ্চিম এশিয়ার সামুদ্রিক পথে কোনও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হলে আমদানি খরচ বাড়তে পারে। তবে ভারত গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল আমদানির ব্যবস্থা করেছে। এই সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণ সংকটের সময় কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
## তেলের দাম বাড়লে কী প্রভাব পড়তে পারে?
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে আমদানি ব্যয়ের উপর। তেল আমদানির খরচ বেড়ে গেলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন পণ্য ও পরিষেবার দামেও চাপ তৈরি হতে পারে।
পেট্রল ও ডিজেলের দাম সরাসরি বাড়বে কি না, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম, ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য, সরকারি কর এবং তেল বিপণন সংস্থাগুলির মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তের উপর। তাই বাব এল মন্দেব সংকটের কারণে সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব জায়গায় জ্বালানির দাম বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে জাহাজ চলাচলে বাধা থাকলে তেল পরিবহণের পথ দীর্ঘ হতে পারে। তাতে ফ্রেট, বিমা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ বাড়বে। সেই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
## এলপিজি সরবরাহ নিয়েও নজর
ভারতের ক্ষেত্রে শুধু পেট্রল ও ডিজেল নয়, রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ার সামুদ্রিক রুটে সমস্যা তৈরি হলে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রেও চাপ আসতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ও বাব এল মন্দেব—দুই রুটেই যদি একসঙ্গে অস্থিরতা বজায় থাকে, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপের উপর জোর দিচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য আপাতত আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার প্রয়োজন নেই। বরং সরকারি নির্দেশিকা ও তেল সংস্থাগুলির ঘোষণার দিকে নজর রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
## বিকল্প পথে জাহাজ চলাচলের সম্ভাবনা
বাব এল মন্দেব প্রণালীতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজগুলিকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে বিকল্প পথে পাঠানো হতে পারে। কিন্তু এই রুটে যাত্রার সময় অনেক বেশি লাগে। ফলে তেল ও অন্যান্য পণ্য পৌঁছতে দেরি হয় এবং পরিবহণ ব্যয় বেড়ে যায়।
বিশ্বের একাধিক দেশ ইতিমধ্যেই বিকল্প বন্দর ও সমুদ্রপথ ব্যবহারের কথা ভাবছে। ভারতও জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরবরাহকারী দেশ এবং বিকল্প পরিবহণপথের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সংকট কতদিন স্থায়ী হবে, তার উপরই নির্ভর করবে বাস্তব পরিস্থিতি।
## ভারতের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ
বাব এল মন্দেব সংকট ভারতের সামনে মূলত তিনটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে—জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, আমদানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশের বাজারে আতঙ্ক ছড়াতে না দেওয়া। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। একদিকে হুথি হামলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর সংক্রান্ত নিরাপত্তা সমস্যা—সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে চাপ রয়েছে।
ভারতের বার্তা হল, পরিস্থিতি নজরে রাখা হচ্ছে এবং দেশের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। আপাতত দেশে জ্বালানি ঘাটতি নিয়ে কোনও নিশ্চিত সরকারি সতর্কতা জারি হয়নি। তবে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তার প্রভাব আমদানি ব্যয়, পরিবহণ খরচ এবং বাজারদরের উপর পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বাব এল মন্দেব সংকটের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ থাকলেও ভারতে এখনই বড়সড় জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। পরিস্থিতির উপর নজর রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই আপাতত নয়াদিল্লির প্রধান লক্ষ্য।


