দেশের প্রশাসন চালানো, নীতি নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি সামলানো এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি—একজন রাষ্ট্রনেতার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দায়িত্বের বিনিময়ে বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা আলাদা বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান। তবে সব দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বেতন এক নয়। কোনও দেশে রাষ্ট্রনেতার বেতন তুলনামূলকভাবে কম, আবার কোনও দেশে তাঁদের বার্ষিক আয় কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী শীর্ষে রয়েছেন। সাম্প্রতিক বেতন সংশোধনের পর সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের আয় আরও বেড়েছে। এর পাশাপাশি হংকংয়ের চিফ এগজিকিউটিভ এবং সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টও বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তালিকায় রয়েছেন।
তবে মনে রাখতে হবে, এই তালিকায় শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদেরও ধরা হয়। বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, ভাতা, বোনাস এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার হিসাব আলাদা হওয়ায় দেশভেদে তুলনা করার সময় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
## ১. সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া সরকারপ্রধান হিসেবে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংয়ের নাম প্রথমেই আসে। সিঙ্গাপুর সরকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত উচ্চ বেতন কাঠামো অনুসরণ করে। সরকারের যুক্তি, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আনতে এবং দুর্নীতির প্রবণতা কমাতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর বার্ষিক বেতন ও বোনাস মিলিয়ে মোট প্যাকেজ ৩.৬ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ আনুমানিক ২৬ থেকে ২৭ কোটি টাকা। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ২.২ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। অর্থাৎ সংশোধিত কাঠামোয় বেতনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়, বিভিন্ন ধরনের কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক বোনাসও যুক্ত থাকে। ফলে কোনও রাজনৈতিক নেতার মোট বার্ষিক আয় নির্ভর করে তাঁর পদ, দায়িত্ব এবং নির্দিষ্ট বোনাস কাঠামোর উপর।
লরেন্স ওং অবশ্য জানিয়েছেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ তিনি পাবেন, তা পাঁচ বছর ধরে দাতব্য কাজে দান করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক নেতাদের উচ্চ বেতন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও সরকার মনে করে, প্রশাসনের মান বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা প্রয়োজনীয়।
## ২. হংকংয়ের চিফ এগজিকিউটিভ জন লি
বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন হংকংয়ের চিফ এগজিকিউটিভ জন লি। হংকং চিনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হলেও এর নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামোয় চিফ এগজিকিউটিভই সরকারপ্রধানের ভূমিকা পালন করেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেতন-তালিকা অনুযায়ী, জন লির বার্ষিক বেতন প্রায় ৭ লক্ষ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। ভারতীয় মুদ্রায় এই পরিমাণ প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার সমান হতে পারে। যদিও মুদ্রার বিনিময় হার পরিবর্তিত হওয়ায় ভারতীয় টাকার অঙ্কে কিছুটা ওঠানামা দেখা যায়।
হংকংয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে জন লির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি, বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, নগর পরিচালনা এবং চিনের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখা। হংকং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় এই পদের গুরুত্বও যথেষ্ট বেশি।
সিঙ্গাপুরের মতো হংকংয়েও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে দায়িত্বের পরিমাণ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বিবেচনা করা হয়। তাই তাঁর বেতন বিশ্বের অধিকাংশ দেশের প্রধানমন্ত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি।
## ৩. সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট
তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের পদ। সুইজারল্যান্ডের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অন্য অনেক দেশের থেকে আলাদা। সেখানে প্রেসিডেন্টের পদটি সাধারণত এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট একজন ফেডারেল কাউন্সিলরের হাতে আসে। ফলে এই পদে দীর্ঘমেয়াদি একক শাসনের বদলে যৌথ প্রশাসনিক ব্যবস্থার গুরুত্ব বেশি।
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের বার্ষিক বেতন আনুমানিক ৬ লক্ষ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় মুদ্রায় তা প্রায় ৫ কোটি টাকার সমান হতে পারে। তবে এই অঙ্কের মধ্যে বেতন, সরকারি ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধা অন্তর্ভুক্ত কি না, তা তালিকা অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেন এবং ফেডারেল কাউন্সিলের কাজের সমন্বয় করেন। যদিও তাঁর ক্ষমতা অনেক দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো এককেন্দ্রিক নয়, তবুও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই পদটির মর্যাদা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
## ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেতন কত?
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বেতন তুলনা করলে বড় পার্থক্য দেখা যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মাসিক বেতন আনুমানিক ১.৬৬ লক্ষ টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা যুক্ত থাকে। বছরে মূল বেতন ও ভাতা মিলিয়ে মোট পরিমাণ কিছুটা বাড়তে পারে।
তবে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর বেতনের তুলনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বেতন অনেকটাই কম। এই পার্থক্য মূলত দুই দেশের প্রশাসনিক কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনৈতিক বেতন নির্ধারণের নীতি এবং সরকারি পরিষেবার মডেলের সঙ্গে যুক্ত।
ভারতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বেতন সংসদীয় সিদ্ধান্ত ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক নেতাদের বেতন বেসরকারি ক্ষেত্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আয়ের সঙ্গে তুলনা করে নির্ধারণ করার নীতি রয়েছে।
## আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বেতনও তুলনামূলকভাবে কম
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকার প্রেসিডেন্টের বেতনও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় অনেক কম। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বার্ষিক সরকারি বেতন ৪ লক্ষ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় এই পরিমাণ প্রায় ৩ থেকে ৩.৫ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে।
তবে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের সরকারি বেতনের পাশাপাশি সরকারি বাসভবন, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থাকে। একইভাবে অন্য দেশের রাষ্ট্রনেতারাও বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুবিধা পান। তাই শুধু বেতন দিয়ে কোনও রাজনৈতিক নেতার সম্পূর্ণ আর্থিক সুবিধা বিচার করা সবসময় যথাযথ নয়।
## কেন সিঙ্গাপুরে এত বেশি বেতন দেওয়া হয়?
সিঙ্গাপুরের সরকার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য উচ্চ বেতন প্রয়োজন। তাঁদের মতে, দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলির সঙ্গে বড় দায়িত্ব যুক্ত থাকে। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য বেসরকারি ক্ষেত্রের দক্ষ ব্যক্তিদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক বেতন দিতে হবে।
আরও একটি যুক্তি হল, উচ্চ বেতন দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতাদের বেতন সাধারণ মানুষের আয় থেকে অনেক বেশি হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক বেতন বৃদ্ধির পর সিঙ্গাপুরে সেই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের বেতন বৃদ্ধি কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওংও স্বীকার করেছেন যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে সংবেদনশীল।
## বেতন তালিকা নিয়ে সতর্কতা জরুরি
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রনেতাদের তালিকা তৈরি করার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বেতনের অঙ্ক আলাদা হতে পারে। কোথাও শুধু মূল বেতন ধরা হয়, আবার কোথাও বোনাস, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাও যোগ করা হয়।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, চিফ এগজিকিউটিভ এবং রাষ্ট্রপ্রধান—এই পদগুলির সাংবিধানিক ক্ষমতা সব দেশে এক নয়। তাই শুধুমাত্র বেতনের ভিত্তিতে তাঁদের দায়িত্ব বা রাজনৈতিক ক্ষমতার তুলনা করা যায় না।
তবুও সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া সরকারপ্রধানদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন। হংকংয়ের চিফ এগজিকিউটিভ এবং সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টও উচ্চ বেতন পাওয়া রাজনৈতিক নেতাদের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। আর ভারতের মতো দেশে প্রধানমন্ত্রীর বেতন তুলনামূলকভাবে কম হলেও দায়িত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে পদটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।


