ভারতীয় ক্রিকেট দলের হেড কোচের পদ নিয়ে জল্পনার মধ্যেই মুখ খুললেন প্রাক্তন ভারতীয় পেসার তথা গুজরাট টাইটান্সের কোচ আশিস নেহরা। কলকাতায় ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (CAB)-এর বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ভবিষ্যতে ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে কি না। জবাবে নেহরা স্পষ্ট করে জানান, এটিকে তিনি নিজের ‘অ্যাম্বিশন’ বলতে চান না। তবে ভবিষ্যতে সুযোগ এলে দায়িত্বটি তাঁর কাছে বড় সম্মান ও গর্বের বিষয় হবে।
### ‘অ্যাম্বিশন’ নয়, তবে দায়িত্ব পেলে সম্মানের
ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নেহরার বক্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের কোনও পদ বা দায়িত্ব নিয়ে তিনি আগে থেকে পরিকল্পনা করেন না। ভারতীয় দলের কোচ হওয়াকেও তাই নিজের লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না।
তবে সুযোগ এলে যে তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন, সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন পেসার। নেহরার কথায়, ভারতীয় দলের কোচ হওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে “great honour and privilege” হবে। অর্থাৎ দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছেন না তিনি, কিন্তু এখনই জাতীয় দলের কোচ হওয়ার দৌড়ে নিজেকে সামনের সারির প্রার্থী হিসেবেও তুলে ধরছেন না।
### স্ত্রীকে ‘অনুমতি’ নিতে হবে!
কোচিংয়ের দায়িত্ব নিয়ে নেহরার মন্তব্যের সবচেয়ে চর্চিত অংশ তাঁর রসিকতা। ভারতীয় দলের কোচ হলে প্রচুর বিদেশ সফর ও দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। সেই প্রসঙ্গেই নেহরা মজার ছলে বলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁকে ‘হাই কমিশন’ অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে হবে!
নেহরা বলেন, আন্তর্জাতিক দলের কোচের দায়িত্বে বছরে প্রায় আট-নয় মাস ভ্রমণ করতে হতে পারে। এরপরই রসিকতা করে জানান, স্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলে সিদ্ধান্ত নিলে নাকি ‘ডিভোর্স’ হয়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি অনুষ্ঠানে হাসির পরিবেশ তৈরি করে এবং দ্রুত আলোচনায় আসে।
### আন্তর্জাতিক কোচের দায়িত্ব কতটা কঠিন?
নেহরার বক্তব্যের পিছনে অবশ্য বাস্তব কারণও রয়েছে। জাতীয় দলের কোচকে নিয়মিত বিদেশ সফর, সিরিজ, টুর্নামেন্ট এবং দীর্ঘ ক্রিকেট সূচির সঙ্গে মানিয়ে চলতে হয়। পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকা এই দায়িত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
নেহরার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব বেশি কোচই তিন-চার বছরের বেশি সময় একই দায়িত্বে থাকতে পারেননি। কারণ কোচের উপর চাপ, প্রত্যাশা, ভ্রমণ এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। তাই শুধুমাত্র পদটি বড় বলেই তিনি এখনই সেই দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না।
### গুজরাট টাইটান্সে নেহরার সাফল্য
ভারতীয় দলের কোচ হওয়ার আলোচনায় নেহরার নাম উঠে আসার অন্যতম কারণ তাঁর IPL সাফল্য। ২০২২ সালে গুজরাট টাইটান্সের প্রথম মরশুমেই তাঁর কোচিংয়ে দলটি IPL চ্যাম্পিয়ন হয়। এরপর ২০২৩ এবং ২০২৬ সালে গুজরাট টাইটান্স রানার্স আপ হয়। ফলে IPL-এ তাঁর কোচিং রেকর্ড যথেষ্ট নজরকাড়া।
তবে নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে নারাজ নেহরা। তাঁর বক্তব্য, গুজরাট টাইটান্সের সাফল্য কোনও একজন কোচ বা অধিনায়কের কৃতিত্ব নয়, বরং গোটা দলের সম্মিলিত ফল। দলগত খেলায় ব্যক্তির পরিবর্তে দলের সাফল্যকেই সামনে রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
### শুভমন গিলের নেতৃত্ব নিয়েও বড় মন্তব্য
CAB-এর অনুষ্ঠানে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ কোচিং নিয়ে নয়, শুভমন গিলের অধিনায়কত্ব নিয়েও কথা বলেন নেহরা। গুজরাট টাইটান্সে গিলকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। নেহরার মতে, গিল এখনও একজন ‘work in progress’ অধিনায়ক। বয়স কম এবং অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতাও তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সময়ের সঙ্গে তিনি আরও উন্নতি করবেন।
নেহরা গিল ও হার্দিক পাণ্ডিয়ার নেতৃত্বের ধরনেও পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, দুজন একেবারেই আলাদা প্রকৃতির অধিনায়ক। হার্দিক বেশি কথা বলেন, আলোচনা করেন এবং কোচের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করেন। অন্যদিকে গিল তুলনামূলকভাবে শান্ত, কিছুটা লাজুক এবং কম কথা বলেন। তবে নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট মনোযোগী এবং শেখার ব্যাপারে আগ্রহী।
### রোহিত-ধোনি নয়, রোহিত-কোহলির ভবিষ্যৎ নিয়েও মত
২০২৭ সালের ODI বিশ্বকাপে রোহিত শর্মা ও বিরাট কোহলি খেলবেন কি না, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দেন নেহরা। তিনি কোনও নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করতে চাননি। তাঁর মতে, বড় টুর্নামেন্টের আগে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে।
ফিটনেস ও পারফরম্যান্স ঠিক থাকলে অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটারকেই ২০২৭ বিশ্বকাপে দেখা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। বয়সকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার পক্ষপাতী নন নেহরা।
### ভারতীয় দলের কোচ হিসেবে কি নেহরাকে দেখা যাবে?
বর্তমানে ভারতীয় দলের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর। একইসঙ্গে ভবিষ্যতের কোচ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে ভিভিএস লক্ষ্মণ এবং আশিস নেহরার মতো নাম নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে নেহরার সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, তিনি নিজে এখনই এই পদের জন্য প্রচার বা দাবি করছেন না।
তবে IPL-এ তাঁর সাফল্য, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত দক্ষতার কারণে ভবিষ্যতে তাঁর নাম বিবেচনায় আসতেই পারে। শেষ পর্যন্ত তিনি ভারতীয় দলের দায়িত্ব নেবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, পরিবারের সম্মতি এবং BCCI-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর।
### আপাতত গুজরাটেই মন নেহরার
সব মিলিয়ে আশিস নেহরার বক্তব্যের মূল সুর হল—ভারতীয় দলের কোচ হওয়া তাঁর কোনও তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নয়। তিনি বর্তমানে গুজরাট টাইটান্সের দায়িত্বেই খুশি। তবে ভবিষ্যতে যদি জাতীয় দলের দায়িত্ব তাঁর সামনে আসে, সেটিকে যে তিনি বড় সম্মান হিসেবে দেখবেন, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
অর্থাৎ **ভারতের কোচ হওয়ার দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে রাখছেন না নেহরা, কিন্তু সম্ভাবনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করছেন না।** আর সেই সিদ্ধান্তের আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন সফরসূচির পাশাপাশি ‘হাই কমিশন’ অর্থাৎ পরিবারের সঙ্গে আলোচনাও যে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ—হাসির ছলে সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি।


