Home বাংলা ডেঙ্গু রুখতে নভেম্বর পর্যন্ত নজরদারি, কড়া নির্দেশ শুভেন্দুর

ডেঙ্গু রুখতে নভেম্বর পর্যন্ত নজরদারি, কড়া নির্দেশ শুভেন্দুর

0
3

বর্ষার মরসুমে রাজ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরও কড়া পদক্ষেপের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মঙ্গলবার স্বাস্থ্যভবনে স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি আক্রান্তের তথ্য গোপন না করা, দ্রুত পরীক্ষা এবং আক্রান্ত এলাকাগুলিতে নজরদারি আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু মোকাবিলায় লাগাতার নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্যভবনের বৈঠকে রাজ্যের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৪ হাজার ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সংক্রমণের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কম বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে এই মুহূর্তে রাজ্যে ১৪৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রয়েছেন বলেও মুখ্যমন্ত্রীর তরফে জানানো হয়েছে।

### ‘ডেঙ্গু হলে তথ্য লুকোবেন না’, চিকিৎসকদের বার্তা

বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য প্রকাশ নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, কোনও রোগীর ডেঙ্গু ধরা পড়লে সেই তথ্য গোপন করা যাবে না। চিকিৎসকদেরও নির্ভয়ে ডেঙ্গুর রিপোর্ট করার বার্তা দেওয়া হয়েছে। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখলে আক্রান্তের সংখ্যা, সংক্রমণের প্রবণতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রশাসন।

জ্বর হলে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছে। ফলে জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে সাধারণ মানুষ যাতে পরীক্ষা করাতে পিছিয়ে না যান, সেই বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, দ্রুত রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নজরদারি শুরু করা।

### নভেম্বর পর্যন্ত চলবে নজরদারি

বর্ষার সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্ক থাকায় সেপ্টেম্বর থেকেই নজরদারি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর মরসুম পুজোর পর পর্যন্ত চলতে পারে। সেই কারণেই শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর পর্যন্ত নয়, নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতেও বর্ষা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতা কমানোর সুযোগ নেই। চলতি বছরে আক্রান্তের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম হলেও মশাবাহিত রোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি, মশার লার্ভা ধ্বংস এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

### কলকাতার ১২টি ওয়ার্ডে মিলেছে ডেঙ্গু

রাজধানী কলকাতাতেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্যভবনের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার ১২টি ওয়ার্ডে এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তবে একইসঙ্গে শহরের ৬১টি ওয়ার্ড এখনও ডেঙ্গুমুক্ত রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। ফলে আক্রান্ত ওয়ার্ডগুলিতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ডেঙ্গুমুক্ত এলাকাগুলিতেও যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।

কলকাতার পাশাপাশি জেলার পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে স্বাস্থ্যভবন সূত্রে জানানো হয়েছে। এর ফলে ওই জেলাগুলিতে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

### পাঁচটি জেলা নিয়ে বিশেষ নজরদারি

রাজ্যে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত এক মাস এবং চলতি বর্ষায় পাওয়া আক্রান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করেই এই এলাকাগুলিকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই জেলাগুলিতে ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আরও জোরদার করার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার উপর নির্ভর না করে সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জমা জল, মশার লার্ভা এবং মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

### পুরসভাগুলির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

ডেঙ্গু মোকাবিলায় পুরসভাগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শহর ও পুর এলাকায় জমা জল পরিষ্কার করা, নিকাশি ব্যবস্থা সচল রাখা, মশার লার্ভা ধ্বংস এবং নিয়মিত স্প্রে করার মতো কাজ মূলত স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমেই হয়। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক পুরসভার প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বেশ কিছু পুরসভা ভেঙে গিয়েছে এবং অনেক জায়গায় প্রশাসক নিয়োগের প্রয়োজন হয়েছে। কিছু পুরসভায় চেয়ারম্যানরা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একইসঙ্গে কয়েকটি পুরসভা উন্নয়ন এবং নাগরিক পরিষেবার কাজও যথাযথভাবে করছে না বলে দাবি করা হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পুরসভাগুলিকে আরও সক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তা এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু স্বাস্থ্য দপ্তরের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় প্রশাসন, পুরসভা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণও প্রয়োজন।

### গত বছরের তুলনায় সংক্রমণ কম, তবু সতর্কতা জরুরি

চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হওয়াকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছে প্রশাসন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম থাকার কথা উঠে এসেছে। তবে কম সংক্রমণের কারণে নজরদারি শিথিল করার কোনও পরিকল্পনা নেই। বরং বর্ষা এবং পুজোর সময় পর্যন্ত সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকায় নভেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সামগ্রিক ভাবে, স্বাস্থ্যভবনের জরুরি বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা স্পষ্ট—ডেঙ্গুর তথ্য লুকিয়ে রাখা নয়, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং স্বচ্ছ রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকাগুলিতে নজরদারি, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং বিনামূল্যে পরীক্ষার সুবিধা আরও কার্যকর করার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে।

এখন দেখার বিষয়, নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই নজরদারি কর্মসূচি রাজ্যের ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। বিশেষ করে কলকাতা, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ার মতো এলাকাগুলিতে আগামী কয়েক সপ্তাহ প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here