কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। **২০৯টি ওয়ার্ডের খসড়া তালিকা প্রকাশ হতেই সাত দফা আপত্তি জানাল সিপিএম।** খসড়া ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ, রাস্তার নামের উল্লেখ, আপত্তি জানানোর সময়সীমা এবং রাজনৈতিক দলগুলির অংশগ্রহণ—একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাম দলটি।
এর আগে কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে **২০৯ করার প্রস্তাব** বিধানসভায় পাস হয়েছে। সেই নতুন বিন্যাসের খসড়া প্রকাশের পরেই আপত্তি ও পরামর্শ জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
## ২০৯টি ওয়ার্ডের খসড়া প্রকাশ
মঙ্গলবার পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের তরফে কলকাতা পুরসভার নতুন ২০৯টি ওয়ার্ডের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক পর কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সীমানায় এত বড় পরিবর্তন হতে চলেছে।
বর্তমানে কলকাতা পুরসভায় ১৪৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় আরও ৬৫টি ওয়ার্ড যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা হবে ২০৯। এই পুনর্বিন্যাস আসন্ন পুরভোটের আগে কলকাতার রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
খসড়া প্রকাশের পরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও তথ্যের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
—
# সিপিএমের সাত দফা আপত্তি কী?
সিপিএম কলকাতা পুর কমিশনারকে চিঠি দিয়ে একাধিক আপত্তি জানিয়েছে। মূল বিষয়গুলি হল—
### ১. সীমানা নির্ধারণে রাস্তার নাম নিয়ে অস্পষ্টতা
সিপিএমের অভিযোগ, নতুন ওয়ার্ডের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম সীমা বোঝাতে যে রাস্তার নাম দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলিই সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই রাস্তার নাম প্রকৃত ওয়ার্ড সীমানা স্পষ্ট করছে না। ফলে সাধারণ ভোটার বা বাসিন্দাদের পক্ষে নিজেদের নতুন ওয়ার্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
### ২. ওয়ার্ডের আকৃতি নিয়েও প্রশ্ন
কিছু নতুন ওয়ার্ডের সংলগ্নতা এবং আকৃতি নিয়েও আপত্তি তুলেছে সিপিএম।
দলের বক্তব্য, কয়েকটি ক্ষেত্রে ওয়ার্ডের সীমানা যথেষ্ট নিয়মিত বা সুনির্দিষ্ট নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাজ এবং ভোটারদের ওয়ার্ড চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
### ৩. আপত্তি জানানোর সময়সীমা বাড়ানোর দাবি
সিপিএমের অন্যতম প্রধান দাবি হল **আপত্তি ও বিকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়ার সময়সীমা অন্তত আরও ১০ দিন বাড়ানো।**
দলের অভিযোগ, বর্তমান সময়সীমা অত্যন্ত কম। এত বড় একটি শহরের ২০৯টি ওয়ার্ডের সীমানা খতিয়ে দেখে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিস্তারিত আপত্তি জানানো কঠিন।
অন্য রাজনৈতিক দলগুলিও সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। মঙ্গলবারের সর্বদলীয় বৈঠকের পর বিরোধীদের পক্ষ থেকে এই দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
—
# রাজনৈতিক দলগুলিকে কেন আগে যুক্ত করা হয়নি?
সিপিএমের আরও একটি বড় প্রশ্ন, **ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলিকে আগে থেকেই আলোচনায় আনা হয়নি কেন?**
বামেদের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলগুলি এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কারণ নতুন ওয়ার্ডের সীমানা সরাসরি ভোটার এবং নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে যুক্ত।
তাই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের মতামত নেওয়া উচিত ছিল বলে দাবি করেছে সিপিএম।
তবে ২৫ আগস্ট কলকাতা পুরসভায় সর্বদলীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস নিয়ে নিজেদের প্রশ্ন ও আপত্তি জানান।
—
# গণশুনানি কোথায়?
সিপিএমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি **গণশুনানি নিয়ে**।
দলের অভিযোগ, ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের বক্তব্য শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও গণশুনানি নিয়ে কোনও স্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি।
তাদের দাবি, সাধারণ মানুষকে নিজেদের ওয়ার্ডের ভবিষ্যৎ সীমানা সম্পর্কে বক্তব্য রাখার সুযোগ দিতে হবে।
এদিকে সর্বদলীয় বৈঠকের পর KMC কর্তৃপক্ষ নতুন করে শুনানির বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা গিয়েছে। একজন KMC আধিকারিক জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নতুন করে শুনানি হতে পারে।
—
# মানচিত্র ও বুথ নম্বর নিয়েও আপত্তি
শুধু রাস্তার নাম নয়, **ভৌগোলিক মানচিত্র এবং বুথ নম্বর না থাকার বিষয়টিও** সিপিএমের আপত্তির তালিকায় রয়েছে।
দলের দাবি, নতুন ওয়ার্ডের প্রস্তাব প্রকাশের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানচিত্র এবং বর্তমান বিধানসভা এলাকার বুথ নম্বর দেওয়া উচিত ছিল।
কারণ ভোটাররা নিজেদের নতুন ওয়ার্ড কোনটি হচ্ছে, তা বুঝতে শুধু কয়েকটি রাস্তার নামের উপর নির্ভর করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। ([Sangbad Pratidin][1])
বিরোধী দলগুলিও প্রতিটি ওয়ার্ডের **ডিজিটাল ম্যাপ প্রকাশের দাবি** তুলেছে।
—
# শুধু সিপিএম নয়, অন্যান্য দলও প্রশ্ন তুলছে
ওয়ার্ড ডিলিমিটেশন নিয়ে আপত্তি শুধু সিপিএমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা মঙ্গলবারের সর্বদলীয় বৈঠকে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং তথ্যের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ সময়সীমা বাড়ানোর দাবি করেছেন, কেউ ডিজিটাল ম্যাপ চেয়েছেন।
এমনকি ভোটার তালিকা নিয়ে চলা **SIR সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে ডিলিমিটেশনকে কীভাবে সমন্বয় করা হবে**, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
—
# ভোটার সংখ্যা নাকি জনসংখ্যা—কোন ভিত্তিতে ওয়ার্ড?
ডিলিমিটেশন নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হল **ওয়ার্ডের জনসংখ্যা নির্ধারণের ভিত্তি**।
বামফ্রন্টের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন জনসংখ্যার পরিবর্তে ভোটার সংখ্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, তাড়াহুড়ো করে এই প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে ডিলিমিটেশনের মূল উদ্দেশ্যই হল বিভিন্ন ওয়ার্ডের মধ্যে ভোটারের সংখ্যা আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা। নতুন ২০৯ ওয়ার্ডের পরিকল্পনায় শহরের জনসংখ্যা ও ভোটার বণ্টনের অসমতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে বলে আগের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছিল।
—
# ২০৯ ওয়ার্ডে বদলে যাবে কলকাতার ভোটের অঙ্ক?
এই ডিলিমিটেশন শুধুমাত্র প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত **কলকাতার রাজনৈতিক মানচিত্র**।
নতুন ওয়ার্ড তৈরি হলে—
* বহু পুরনো ওয়ার্ডের সীমানা বদলে যাবে
* নতুন ওয়ার্ডে নতুন প্রার্থী প্রয়োজন হবে
* বর্তমান কাউন্সিলরদের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে
* বুথভিত্তিক সংগঠন নতুন করে সাজাতে হবে
* ভোটারদের নতুন ওয়ার্ড সম্পর্কে সচেতন করতে হবে
* রাজনৈতিক দলগুলিকে নতুন করে ভোটের অঙ্ক কষতে হবে
তাই পুরভোটের আগে ডিলিমিটেশনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে টানাপোড়েন আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
—
# সেপ্টেম্বর ৩ পর্যন্ত আপত্তি জানানোর সুযোগ
খসড়া প্রকাশের পর **৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত** প্রস্তাবিত ওয়ার্ড সীমানা নিয়ে পরামর্শ ও আপত্তি জানানোর সময় দেওয়া হয়েছে।
তবে এই সময়সীমা আরও বাড়ানোর দাবি উঠেছে। সিপিএম চায় অন্তত আরও ১০ দিন সময় দেওয়া হোক, যাতে সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলগুলি খসড়া ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিজেদের মতামত জানাতে পারে।
—
# নতুন ওয়ার্ড মানে বাড়বে প্রশাসনিক চাপ?
কলকাতা পুরসভায় ৬৫টি অতিরিক্ত ওয়ার্ড তৈরি হলে শুধু নির্বাচনী মানচিত্রই বদলাবে না, প্রশাসনিক পরিকাঠামোর উপরও বাড়তি চাপ পড়বে।
নতুন ওয়ার্ড মানে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত কাউন্সিলর, ওয়ার্ড অফিস, কর্মী এবং নাগরিক পরিষেবার পরিকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে।
সর্বদলীয় বৈঠকেও KMC-এর এই অতিরিক্ত প্রশাসনিক পরিকাঠামো সামলানোর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
—
# কলকাতা পুরভোটের আগে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা
কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আসন্ন পুরভোটের সঙ্গে আলাদা করে দেখা যাচ্ছে না।
নতুন ওয়ার্ডে রাজনৈতিক দলগুলির শক্তি কতটা, কোন এলাকায় কার সংগঠন শক্তিশালী, কোন প্রার্থী জনপ্রিয়—সবকিছু নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
ইতিমধ্যেই বিজেপি কলকাতা পুরভোটের প্রস্তুতির জন্য আলাদা কমিটি তৈরি করেছে এবং সুকান্ত মজুমদারকে দায়িত্ব দিয়েছে। ফলে ডিলিমিটেশন চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী প্রস্তুতিও আরও জোরদার হতে পারে।
—
# শেষ কথা
কলকাতা পুরসভার **১৪৪ থেকে ২০৯ ওয়ার্ডে যাওয়ার প্রক্রিয়া** শুরু হওয়ার পরই বিতর্ক দানা বেঁধেছে। মঙ্গলবার নতুন ওয়ার্ডের খসড়া প্রকাশের পর সিপিএম সাত দফা আপত্তি জানিয়েছে।
রাস্তার নামের অস্পষ্টতা, ওয়ার্ডের সীমানা ও আকৃতি, আপত্তি জানানোর জন্য কম সময়, রাজনৈতিক দলগুলিকে আলোচনায় না আনা, গণশুনানি, মানচিত্র এবং বুথ নম্বর—সব মিলিয়ে ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার দাবি তুলেছে বামেরা।
এদিকে অন্যান্য বিরোধী দলও সময়সীমা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ম্যাপ প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এখন নজর থাকবে **৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কতগুলি আপত্তি জমা পড়ে এবং তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত ওয়ার্ড সীমানায় কী পরিবর্তন আনা হয়।** কলকাতা পুরভোটের আগে এই ডিলিমিটেশনই যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।


